বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

সিনেমা

ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে বদলাচ্ছে বলিউড: হাত কোথায় থাকবে, ঠিক করেন যাঁরা

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৮ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
বলিউডের শুটিং নিয়ে বিনোদন ঝলকের গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

সিনেমার পর্দায় ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখলে দর্শক সাধারণত শুধু অভিনেতাদেরই দেখেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে, ক্যামেরার পাশে, এমন কিছু মানুষ কাজ করেন, যাঁদের কাজই হলো সেই দৃশ্যগুলোকে নিরাপদ, পরিকল্পিত আর সম্মতিভিত্তিক করে তোলা। বলিউডে তাঁদের উপস্থিতি এখন ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের পেশার নাম ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর, অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ দৃশ্য সমন্বয়ক। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে এই নতুন পেশা ভারতীয় সিনেমার শুটিং সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে।

এতদিন ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পে নগ্নতা কিংবা যৌনদৃশ্যের শুটিংয়ে অনেকটাই নির্ভর করা হতো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দৃশ্য ধারণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা সুরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। বিশ্বজুড়ে মিটু আন্দোলনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পশ্চিমা সিনেমা দুনিয়া পর্দায় ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের সাহায্য নিতে শুরু করে, আর সেই ধারা এখন ভারতেও এসেছে।

ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের কাজটা ঠিক কী, সেটা বোঝাতে বলিউডের এই পেশার অন্যতম মুখ আস্থা খান্না একটা সহজ তুলনা টেনেছেন। তাঁর মতে, যেভাবে একজন স্টান্ট পরিচালক মারামারির দৃশ্যের পরিকল্পনা করেন, তেমনি ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ক্ষেত্রেও তাঁরা ঠিক করে দেন, হাত কোথায় থাকবে, চুল কীভাবে থাকবে, যাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ঠিক করতে না হয়। অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ দৃশ্যও এখন আর শুটিংয়ের দিনের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়, এটা আগাম পরিকল্পিত একটা কোরিওগ্রাফি।

এই পেশাজীবীদের কাজ শুরু হয় শুটিংয়ের অনেক আগেই। আস্থা খান্না জানিয়েছেন, সাধারণত অভিনয়শিল্পীদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য হলো, চিত্রনাট্যে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য রয়েছে, এ কথা যেন অভিনয়শিল্পীরা আগেই জানতে পারেন। কাজটিতে যুক্ত হওয়ার চুক্তিতে সই করার আগে তাঁরা এসব দৃশ্যে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান। এভাবেই সম্মতির বিষয়টি শুটিংয়ের কেন্দ্রে চলে আসে, শেষ মুহূর্তের চাপে নয়।

শুটিংয়ের সময়ও তাঁদের সঙ্গে থাকে শালীনতা রক্ষার বিশেষ উপকরণ, যেগুলোকে বলা হয় মডেস্টি টুলস। এগুলোর সাহায্যে অভিনয়শিল্পীরা অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংস্পর্শ কমিয়ে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের অভিনয় করতে পারেন। আস্থা খান্নার মতে, ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের কাজ কেবল যৌনতার অভিনয় বা যৌনদৃশ্যের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিসর অনেক বড়, এর মধ্যে সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, হয়রানি ও নগ্নতার মতো বিষয়ও থাকতে পারে।

ভারতে এই পেশাদার চর্চা আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর প্রথম দিকের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় গেহরাইয়াঁকে। নির্মাতা করণ জোহরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ছবিটি ২০২২ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পায়। ছবিটিতে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন আস্থা খান্না, অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ এবং ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনায় সহায়তা করেন তিনি। অন্যদিকে ইনটিমেসি কোচ নেহা ব্যাসো শারীরিক সম্পর্কের গতিবিধি এবং সম্মতি নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন।

ধীরে ধীরে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য নির্মিত অন্যান্য ছবিতেও এ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তনটির প্রধান চালিকা শক্তি স্ট্রিমিং সেবাগুলো। স্ট্রিমিংয়ের বিস্তারে গল্প বলার ধরনে এসেছে সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্য, আর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বাস্তবসম্মত উপস্থাপনার চাহিদাও বেড়েছে। নেহা ব্যাসো মনে করেন, এখন সেন্সরশিপ অনেক কম, আর নিষিদ্ধ বা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গল্প বলার ক্ষেত্রেও আগ্রহ ও উন্মুক্ততা বেড়েছে।

অপরাধনির্ভর সিরিজ মির্জাপুর স্পষ্ট ও খোলামেলা দৃশ্যের জন্য পরিচিত। সিরিজটির প্রথম দিকের মৌসুমগুলোতে অবশ্য ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছিলেন না। তবে এর প্রধান অভিনয়শিল্পী রসিকা দুগ্গাল মনে করেন, এ ধরনের বিশেষজ্ঞরা কাজের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রথম দিকের মৌসুমগুলোতে প্রত্যেককে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী আলাদাভাবে সীমারেখা সামলাতে হতো। যাতে কারও সঙ্গে কোনোভাবেই সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে এবং সবার উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়, সে জন্য ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

এই বদলের পেছনে একটা অন্ধকার ইতিহাসও আছে। বলিউডের চাকচিক্যময় বাহ্যিক রূপের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ছিল বিশৃঙ্খল এক কর্মপরিবেশ, যেখানে ব্যক্তিগত সীমারেখা প্রায়ই লঙ্ঘিত হতো। আস্থা খান্না জানিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে কোনো অভিনেতা তাঁর সহ অভিনেত্রীর সম্মতি ছাড়াই তাঁকে চুমু দিয়েছেন। শুটিংয়ের স্বাভাবিক গতির মধ্যে যাতে এ ধরনের কিছু না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই তাঁদের কাজ। তাঁর মতে, তাঁর কাজ এমন পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করে, যার মধ্য দিয়ে গেলে একজন মানুষকে হয়তো কয়েক বছর ধরে থেরাপি নিতে হতে পারে, অথচ সেই ক্ষত কখনোই পুরোপুরি শুকাবে না।

তবু এই পেশা এখনো ভারতে সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি। ভারতের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্প মিলিয়ে এ ধরনের পেশাজীবীর সংখ্যা মাত্র এক ডজনের কিছু বেশি। বড় বাজেটের অনেক বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগও খুব বেশি নেই, কারণ এসব ছবির প্রধান অভিনয়শিল্পীদের অনেকে পর্দায় স্পষ্ট শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, এমনকি চুম্বনের দৃশ্যেও অভিনয় করতে চান না। আবার কিছু ছবিতে নির্দিষ্ট কোনো ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছাড়াই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণ করা হয়, অভিজ্ঞ কিছু পরিচালক এখনো নিজেরাই এসব দৃশ্য পরিচালনা করেন।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা বাধ্যবাধকতা নেই। তাই চলচ্চিত্রশিল্পের কেউ কেউ আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো একসময় পুরো শিল্পের জন্য অভিন্ন মানদণ্ড চালু করবে। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন এই বদলটা নির্ভর করবে নির্মাতা ও প্রযোজকদের সদিচ্ছার ওপর। তবে একটা কথা পরিষ্কার, বলিউডে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং আর আগের মতো শুধু বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে চলছে না, পরিকল্পনা, সম্মতি আর নিরাপত্তা এখন সেই সেটেরই অংশ হয়ে উঠছে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন