সিনেমা হলের পরিবেশ ঠিক হলে দর্শক অবশ্যই সিনেমা হলে যাবে, এই সোজাসাপ্টা কথাটাই বললেন অভিনেতা শরীফুল রাজ। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি হলের বর্তমান অবস্থা, বছরে কতগুলো ভালো সিনেমা দরকার, ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির চাপ, আর নিজের আসন্ন কাজ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে ২৬ অক্টোবর।
সাক্ষাৎকারের শুরুটাই জানিয়ে দেয়, রাজ এখন ঢাকার বাইরে ঘুরতে আর ফটোশুটের কাজে ব্যস্ত। ফোনে তাঁকে যখন পাওয়া গেল, তখন তিনি দেবতাখুমে বোট চালাচ্ছিলেন। এমন একটা লোকেশনে ছিলেন, যেখানে কথা বলার মতো অবস্থাই ছিল না, নেটওয়ার্কও ছিল না। এই ছোট্ট বিবরণ থেকেই বোঝা যায়, কাজের বাইরে ঘোরাঘুরি আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাটা তাঁর জীবনের অংশ।
কথা ঘুরল তাঁর প্রথম সিনেমা 'আইসক্রিম'-এর দিকে। ১০ বছর পর সিনেমাটি চরকিতে মুক্তি পেয়েছে, আর সেই রাতে আড্ডাও জমেছিল। রাজ জানালেন, সেদিন একই সঙ্গে পরিচালক রেদওয়ান রনির জন্মদিন ছিল, সেই উপলক্ষেই সিনেমাটি ঘিরে আড্ডা হয়। ১০ বছর আগের শুটিংয়ের মজার ঘটনা, সেই সময়ের হইচই, সবই উঠে এল স্মৃতিতে। আড্ডায় এ টি এম শামসুজ্জামান আর দিতিকে নিয়েও কথা হয়। সিনেমার চারজন শিল্পী মারা গেছেন, তাঁদের মিস করার কথাও বললেন রাজ।
প্রথম সিনেমা থেকে কী শিখেছেন, এই প্রশ্নে রাজের জবাব ছিল পরিষ্কার। তাঁর মতে, তাঁর সবটাই প্রথম সিনেমা থেকে শেখা। রনি হাত ধরে ধরে শিখিয়েছেন। শুটিংয়ে গিয়েই তিনি অনেক কিছু জানলেন, বুঝলেন, শিখলেন। সিনেমার শুটিং আর অভিনয়ের মধ্যে ভালো লাগা শুরু করল, আর তখনই মনে হলো, আরও অনেক সিনেমা করা দরকার। সেই চেষ্টাই তিনি করে যাচ্ছেন।
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা তখন ছিল কি না, এই প্রশ্নে রাজ স্বীকার করলেন, অভিনয়ের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কী হবে না হবে, তা বুঝে উঠতে সময় লেগেছে। যেকোনো কিছুকে পেশা হিসেবে নেওয়া কঠিন। এখন তিনি অভিনয় উপভোগ করছেন, আর সেটাই তাঁর জীবনের সুন্দর সিদ্ধান্ত। তাঁর ভাষায়, তিনি কম সিনেমা করেন, কিন্তু সেই তুলনায় অনেক ভালো ভালো চিত্রনাট্য পাচ্ছেন। এখন অনেক ভালো সিনেমা হচ্ছে, আর সব মিলিয়ে সিনেমা নিয়ে তিনি ভালো আছেন।
এরপরই এল সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, হল আর দর্শক প্রসঙ্গ। সিনেপ্লেক্স ছাড়া সিনেমা দেখার মাধ্যম এখন নেই বললেই চলে, এই প্রসঙ্গে রাজ বললেন, সিঙ্গেল স্ক্রিনের সেই উপযোগিতা আর নেই, সময় বদলেছে। এখন পরিবেশের দিক থেকে একটা হলকে গোছানো হতে হবে। ধুলাবালু, জরাজীর্ণ অবস্থা, এসি নেই, এমন পরিবেশে দর্শক সিনেমা দেখবে না, এটাই স্বাভাবিক। হলের পরিবেশ ঠিক হলে দর্শক অবশ্যই সিনেমা হলে যাবে। তবে হল ঠিক হলেই হবে না, সেই সঙ্গে ভালো সিনেমাও দিতে হবে।
হল আর দর্শক চাঙা রাখার জন্য বছরে কতটা ভালো সিনেমা দরকার, এই প্রশ্নে রাজের উত্তর ছিল সংখ্যায় স্পষ্ট। তাঁর মতে, কমপক্ষে ১২টা সিনেমা দরকার। আর তা প্ল্যানিং করে মুক্তি দিতে হবে। এখন ঈদ ছাড়া সিনেমা মুক্তির চর্চাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এটা ভালো উদাহরণ হতে পারে না। তিনি নিজেও চান ঈদ ছাড়া তাঁর সিনেমা মুক্তি পাক। বরং ঈদে একসঙ্গে অনেক সিনেমা মুক্তি পেলে আরও চাপ তৈরি হয়। এই কথাটা শুধু একজন অভিনেতার মতামত নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির মুক্তি পরিকল্পনা নিয়ে একটা বড় প্রশ্নও তুলে দেয়।
'বনলতা এক্সপ্রেস' নিয়ে হংকং যাওয়ার অভিজ্ঞতাও শোনালেন রাজ। বিদেশে উৎসবে খুব বেশি যাওয়ার সুযোগ হয় না তাঁর। সেখানে বিভিন্ন দেশের দর্শক সিনেমাটির সঙ্গে কানেক্ট করতে পারলেন, গল্প আর প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন করলেন। দেশের সিনেমা নিয়ে তাঁদের জানার আগ্রহ বুঝতে পারলেন তিনি। একটি সিনেমা কত গভীর থেকে তাঁরা দেখেন, সেটা নতুন অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া হংকং তাঁর পছন্দের পরিচালক ওং কার-ওয়াইয়ের দেশ, সেখানে কিছু শপিং করলেন, ঘুরলেন, ভালোই সময় কাটল।
সিনেমাসংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপগুলোতে দর্শকদের একটা দাবি প্রায়ই ওঠে, শাকিব খানের সঙ্গে রাজের সিনেমা হোক। এই প্রসঙ্গে রাজ বললেন, শাকিব গুণী শিল্পী। প্রযোজক পরিচালক তাঁদের নিয়ে ভাবলে তাঁর আপত্তি নেই। তাঁর কাজ অভিনয় করা, শাকিবের সঙ্গে অভিনয়ে তিনি রাজি আছেন, তাঁর সমস্যা নেই। সবার সঙ্গেই কাজ করতে চান তিনি। একইভাবে নাজিফা তুষির সঙ্গেও প্রথম সিনেমার পর আর কোনো সিনেমা না করার প্রসঙ্গে তিনি বললেন, তাঁর ইচ্ছা আছে, তাঁরা বন্ধু, প্রযোজক পরিচালকদের তাঁদের নিয়ে ভাবতে হবে।
সর্বশেষ কোন সিনেমা ভালো লেগেছে, এই প্রশ্নে রাজ জানালেন, টানা ব্যস্ততায় অনেক সিনেমা দেখা হয়নি। এর মধ্যে 'মুসাফির ক্যাফে' বেশ ভালো লেগেছে। আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতুর 'ডিগার' দেখার তালিকায় রেখেছেন। আর ঈদের সিনেমার শুটিং কবে থেকে, এই প্রশ্নে তিনি বললেন, সিনেমাটি সম্পর্কে এখনই কিছু বলতে পারছেন না। তবে সব ঠিক থাকলে শিগগির শুটিং শুরু করবেন। অর্থাৎ ঈদের কাজের খবর এখনো পুরোপুরি খোলাসা নয়, তবে শুটিং শুরুর ইঙ্গিত মিলেছে।
সব মিলিয়ে এই সাক্ষাৎকারে শরীফুল রাজকে পাওয়া গেল একজন ভাবনাচিন্তা করা অভিনেতা হিসেবে, যিনি শুধু নিজের সিনেমা নিয়ে ভাবছেন না, হলের পরিবেশ, মুক্তির পরিকল্পনা আর বছরে ভালো সিনেমার সংখ্যা নিয়েও ভাবছেন। হল ঠিক করা আর ভালো সিনেমা দেওয়া, এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া দর্শক ফেরানো যাবে না, এই বার্তাটাই তাঁর কথায় বারবার ফিরে এসেছে। ঈদের সিনেমার শুটিং শুরু হলে সেই খবরও নিশ্চয়ই সামনে আসবে।
