বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শাবানা আজমি ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বরাবরই স্পষ্টভাষী। এবার একটি পডকাস্ট আলোচনায় তিনি আরও একধাপ এগিয়ে নিজের ধর্মীয় অবস্থান, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্বামী জাভেদ আখতারের সঙ্গে মতের ফারাক নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন। জানালেন, মুসলিম পরিচয়ে গর্বিত হলেও তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন না।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাবানা জানান, মুসলিম হিসেবে ঈদের আনন্দ, উর্দু ভাষার মাধুর্য ও ইসলামি খাবার উপভোগ করলেও ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর কাছে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। শুধু তাই নয়, ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকা উচিত নয় বলেও মত দিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
পারিবারিক পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে শাবানা জানান, তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত উর্দু কবি ও গীতিকার কাইফি আজমি, যিনি নিজেকে নাস্তিক হিসেবেই পরিচয় দিতেন। অন্যদিকে মা শওকত আজমি কিছুটা ধর্মাচরণ করলেও বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। ফলে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক বেশি গড়ে ওঠে।
সম্প্রতি আইআইএমইউএন-এর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই আলাপচারিতায় স্বামী জাভেদ আখতারের সঙ্গে মতের ফারাকের কথাও অকপটে বলেছেন শাবানা। তিনি জানান, মাঝেমধ্যে তিনি 'মাশাআল্লাহ' বা 'ইনশাআল্লাহ' বললে জাভেদ প্রশ্ন তোলেন, কেন বারবার এসব শব্দ বলেন তিনি। জাভেদের যুক্তি, কেউ যদি সবসময় তাঁকে 'প্রভুজি কি মরজি' বলে, তাহলে তাঁর কেমন লাগবে? কিন্তু শাবানার মতে, এই শব্দগুলো তাঁর মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরই অংশ, তাই এসবের ব্যবহার তিনি স্বাভাবিকভাবেই দেখেন।
নিজের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে শাবানা বলেন, 'হ্যাঁ, আমি মুসলিম। আমার ঈদ ভালো লাগে, উর্দু ভাষা ভালো লাগে, খাবারও ভালো লাগে। কিন্তু আমরা নামাজ পড়ি না এবং ধর্মের সঙ্গে আমাদের সেই অর্থে কোনও সম্পর্ক নেই।'
শাবানা আরও জানান, ধর্ম নিয়ে তাঁর কখনোই বিশেষ কৌতূহল ছিল না। তবে কেউ ধর্ম পালন করে মানসিক শান্তি পেলে তাঁকে সেই স্বাধীনতা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি; অন্যের বিশ্বাসে অকারণে আঘাত করার প্রয়োজন নেই।
শাবানা ও জাভেদ, দুজনেই ধর্ম নিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ্যে জানিয়ে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তবু ধর্মকে ব্যক্তিগত রাখা আর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা, এই দুটো অবস্থানেই তাঁরা বরাবর অনড়। সমাজে ধর্ম নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে শাবানার এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী সত্তরের দশকের সমান্তরাল সিনেমার অন্যতম মুখ। কাইফি আজমির কন্যা হিসেবে সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা শাবানা 'অঙ্কুর', 'অর্থ', 'মাসুম', 'গডমাদার'সহ বহু প্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করেছেন; অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। ১৯৮৪ সালে গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
অভিনয়ের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় শাবানা। ১৯৯৭ সালে তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হন। শিল্প-সংস্কৃতি আর সমাজসেবা, দুটো ক্ষেত্রেই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট: ধর্ম ব্যক্তির, কিন্তু মানবতা সবার।
চলচ্চিত্রে শাবানার যাত্রা শুরু ১৯৭৪ সালে শ্যাম বেনেগালের 'অঙ্কুর' দিয়ে। পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে অভিনয়ে স্নাতক শাবানা সত্তর ও আশির দশকে সমান্তরাল সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ হয়ে ওঠেন। মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি থেকে শিল্পনির্ভর সিনেমা, দুই ধারাতেই তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে।
ওই পডকাস্টের বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে। কেউ তাঁর স্পষ্টভাষিতার প্রশংসা করছেন, কেউ আবার দ্বিমত পোষণ করছেন। শাবানা অবশ্য বরাবরই এমন আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে অভ্যস্ত; ধর্ম ও সমাজ নিয়ে নিজের অবস্থান তিনি কখনোই গোপন করেননি।
