বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমেছিলেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা দুটি দলের পর্যটকেরা। সাগরের স্রোতের টানে ভেসে যান তাদের কয়েকজন। সেই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত চার পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও একজন।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার বিকেলে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘর-সংলগ্ন সৈকতে গোসলে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু হয়। তারা হলেন ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকার মোকাররম হোসেনের ছেলে আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম (২৪), একই এলাকার সাইবুল হক জিসান (২৩) এবং চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার আকাশ (২১)। এছাড়া আরও দুজন নিখোঁজ ছিলেন।
বৃহস্পতিবার সকালে হিমছড়ি এলাকায় সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসে চতুর্থ মরদেহটি। জেলা প্রশাসনের বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান ধারণা করছেন, মরদেহটি চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার হারুনের। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় বিচকর্মী ও লাইফগার্ড কর্মীরা মরদেহটি উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে মরদেহটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
আরটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে হিমছড়ি পয়েন্টেই মরদেহটি ভেসে আসে। তীরে অপেক্ষারত বন্ধুদের মাধ্যমে মরদেহটি হারুনের বলে শনাক্ত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়দের বরাতে আরটিভি জানিয়েছে, হারুনকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়েই ঢাকার তিন তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তাদের ভাষ্য, গোসলে নামা সাতজনের কেউই সাঁতার জানতেন না। পানিতে ডুবে যেতে দেখে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়ে তারাও স্রোতের কবলে পড়েন।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে ঘটনার আরও কিছু বিবরণ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে সেখানে বলা হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় পর্যটকদের একটি দল হিমছড়ির মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘর-সংলগ্ন সৈকতে গোসল করতে নামে। সাগরের ঢেউ ও স্রোতের টানে কয়েকজন ভেসে যান। তাদের পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে স্থানীয় লোকজন উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হলে পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লর রহমান জানান, স্থানীয়রা একজনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন।
এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এস এম নাফিসুর রহমান নিবিড় (২২)। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ঢাকার উত্তরা আজিমপুর এলাকার নাবিবুর রহমানের ছেলে। তার সন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম।
প্রতিবেদনগুলোতে দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ উঠে এসেছে। এক, ঘটনাস্থলটি ছিল সৈকতের অনিরাপদ পয়েন্ট। দুই, জোয়ার-ভাটার সময় স্রোতের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। তিন, গোসলে নামা তরুণদের কেউই সাঁতার জানতেন না। একে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে আরও বেশি মানুষ স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঘটনা সৈকত দুর্ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায়।
এই দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটও উদ্বেগজনক। শীত মৌসুমের শুরুতে কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বাড়ছে। মাত্র একদিন আগেই সাজেকে গোলাগুলির ঘটনায় প্রায় তিন হাজার পর্যটককে উদ্ধার করে সরিয়ে নিতে হয়েছে, সেখানে এখন পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা চলছে। পরপর দুটি ঘটনা পর্যটক-নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সৈকতে গোসলের ক্ষেত্রে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। সবসময় নির্দিষ্ট নিরাপদ জোন বেছে নেওয়া, লাইফগার্ড ও বিচকর্মীদের নির্দেশনা মানা, জোয়ারের সময় গভীর পানিতে না নামা এবং সাঁতার না জানলে সতর্ক থাকা দরকার। অপরিচিত সৈকতে নামার আগে স্থানীয়দের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
নিখোঁজ নিবিড়ের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন।
