একটি মাত্র দৃশ্য বানাতে সাড়ে ছয় বছর। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও রামায়ণের পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির ভাষ্য ঠিক এটাই। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, রাবণ ও জটায়ুর যুদ্ধের একটি দৃশ্য নির্মাণ করতেই লেগেছে সাড়ে ছয় বছর। দৃশ্যটি বোঝানো থেকে শুরু করে পুরোটা শেষ হওয়া পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় লেগেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, এই একটি দৃশ্য তৈরি করতে ঠিক কতটা পরিশ্রম হয়েছে, তা নিয়ে তিনি এক ঘণ্টা ধরে কথা বলতে পারেন।
কেন এত সময় লাগল, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন পরিচালক। এই দৃশ্যের সবকিছু একেবারে গোড়া থেকে তৈরি করতে হয়েছে, আর এই কাজে যুক্ত ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। অর্থাৎ তৈরি কোনো সেট বা তৈরি কোনো ডিজিটাল সম্পদ তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়নি, প্রতিটি উপাদান নতুন করে ভাবা, বানানো আর পরীক্ষা করা হয়েছে। বড় বাজেটের ছবিতে এ ধরনের কাজ সাধারণ হলেও একটি দৃশ্যের পেছনে সাড়ে ছয় বছর ব্যয় হওয়ার ঘটনা বিরল।
জটিলতা আরো বেড়েছিল রাবণের উড়ন্ত যান পুষ্পক বিমানের নকশা নিয়ে। নীতেশ জানিয়েছেন, পুষ্পক বিমানের নকশা তৈরি করতেও প্রায় দুই বছর কাজ করেছেন নির্মাতারা। শুরুতে যে নকশা ভাবা হয়েছিল, চূড়ান্ত নকশার সঙ্গে তার অনেক পার্থক্য ছিল। আর এতেই তৈরি হয় নতুন জটিলতা, কারণ প্রথম নকশার ওপর ভিত্তি করেই রাবণ ও জটায়ুর যুদ্ধের দৃশ্যের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে পুষ্পক বিমানের নকশা বদলে যাওয়ায় ওই দৃশ্যেও আনতে হয় একাধিক পরিবর্তন। অর্থাৎ একটি নকশা বদলালে তার ঢেউ গিয়ে লাগে গোটা দৃশ্যের পরিকল্পনায়, আর সেই ঢেউ সামলাতেই সময় বেড়েছে।
এই প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ছবির প্রধান অভিনেতা রণবীর কাপুরও। তাঁর আক্ষেপ, ছবির জটিল দৃশ্যগুলো দেখেই অনেক দর্শক সেগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বলে মনে করছেন। অথচ এসব দৃশ্যের পেছনে রয়েছে অসংখ্য শিল্পীর নিরলস পরিশ্রম। রণবীরের মতে, হাজার হাজার শিল্পী দিনরাত এক করে কাজ করছেন, একটি দৃশ্যের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিখুঁত করে তুলতে তাদের দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে হয়। সেই কাজকে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি বলে চিহ্নিত করলে শিল্পীদের অবদান আড়ালেই থেকে যায়। উন্নত মানের দৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে যে বিপুল সময়, দক্ষতা ও শ্রমের প্রয়োজন, দর্শকদের সেই বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন অভিনেতা।
এই বিতর্ক এখন বলিউডে বেশ পরিচিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে দর্শকের একাংশ যেকোনো চোখ ধাঁধানো দৃশ্য দেখলেই সন্দেহ করেন, এটা বুঝি যন্ত্রের তৈরি। নির্মাতাদের পাল্টা যুক্তি হলো, যন্ত্র সাহায্য করতে পারে, কিন্তু গল্প বলার সিদ্ধান্ত, আলো, গতি, আবেগ আর চরিত্রের শারীরিক ভাষা এখনো মানুষের হাতেই থাকে। রামায়ণের এই সাড়ে ছয় বছরের গল্প সেই যুক্তির পক্ষে একটি শক্ত উদাহরণ। একটি দৃশ্য যদি সত্যিই যন্ত্রের এক ক্লিকের কাজ হতো, তাহলে তার পেছনে হাজার হাজার মানুষের বছরের পর বছর লাগত না।
ছবিটির প্রসঙ্গও এখানে মনে রাখা জরুরি। নীতেশ তিওয়ারি পরিচালিত রামায়ণে রামের চরিত্রে অভিনয় করছেন রণবীর কাপুর, সীতার ভূমিকায় রয়েছেন সাই পল্লবী এবং রাবণের চরিত্রে দেখা যাবে যশকে। দুই পর্বে মুক্তি পাওয়ার কথা ছবিটির, প্রথম পর্ব মুক্তি পাওয়ার কথা ৫ নভেম্বর। মুক্তির দিন যত এগিয়ে আসছে, ছবিটি নিয়ে আলোচনাও তত বাড়ছে। এর আগে নতুন ট্রেলারে রাবণ ও জটায়ুর যুদ্ধের ঝলক দেখে দর্শক মুগ্ধ হয়েছিলেন, এবার সেই যুদ্ধের দৃশ্যের পেছনের শ্রমের গল্প সামনে এলো।
মুক্তির আগে অগ্রিম বুকিং নিয়েও আলোচনা চলছে, আর নির্মাতাদের এই সাক্ষাৎকার সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দর্শক এখন শুধু এটা জানতে চাইছেন না যে ছবিটি কেমন হবে, তারা জানতে চাইছেন ছবিটি কীভাবে বানানো হয়েছে। একটি দৃশ্যে সাড়ে ছয় বছর আর পুষ্পক বিমানের নকশায় দুই বছর, এই দুটি সংখ্যা মুক্তির আগের প্রচারের চেয়েও বেশি কথা বলছে। ৫ নভেম্বর হলে গিয়ে দর্শক যখন রাবণ ও জটায়ুর যুদ্ধ দেখবেন, তখন পর্দার আড়ালের এই দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা তাদের মনে থাকবে বলেই আশা করছেন নির্মাতারা।
