বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আবারও বড় খবর এলো ভারতের গোয়া থেকে। ভারতের সবচেয়ে পুরোনো এবং বৃহত্তম চলচ্চিত্র উৎসব ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ার (আইএফএফআই) ৫৭তম আসরে নির্বাচিত হয়েছে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’। উৎসবের ‘ইমার্জিং ফিল্মমেকারস’ বিভাগে জায়গা পেয়েছে সিনেমাটি। রোববার, ১ নভেম্বর এই বিভাগের নির্বাচিত সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছে উৎসব কর্তৃপক্ষ।
উৎসবের ৫৭তম আসরের পর্দা উঠবে ২০ নভেম্বর, গোয়ায়। এই বিভাগে ‘রইদ’-এর সঙ্গে নির্বাচিত হয়েছে মোট নয়টি সিনেমা। তালিকায় আছে ভ্যালেন্তিনা মরেলের ‘ফরএভার ইউর ম্যাটারনাল এনিম্যাল’, আরভিন বেলারমিনোর ‘রিয়া’, কনস্তান্তিনা কতজামানির ‘টাইটানিক ওশান’, জেলেনা মাক্সিমোভিচের ‘আনটিল দ্য ডে এন্ডস’, রিড ভ্যান ডিকের ‘অ্যাটনমেন্ট’, রাফিকি ফারিয়ালার ‘কঙ্গো বয়’, পি আর মনেচিল্লো পাতিন্দোলের ‘আই গ্রিউ অ্যান ইঞ্চ হোয়েন মাই ফাদার ডাইড’ এবং জেনিস লেনজের ‘ওয়াসিস’। বিশ্বের নানা প্রান্তের এই ছবিগুলোর পাশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে ‘রইদ’।
‘ইমার্জিং ফিল্মমেকারস’ বিভাগ নিয়ে উৎসব কর্তৃপক্ষের বার্তাটাও তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের ভাষায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সম্ভাবনাময় ও দূরদর্শী তরুণ নির্মাতাদের স্বাধীন ও শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে নতুন মাত্রা পাচ্ছে সিনেমা। যেসব সাহসী ও প্রতিশ্রুতিশীল নির্মাতা সমসাময়িক বিশ্ব চলচ্চিত্রের আবেগের গভীরতা, নান্দনিক বৈচিত্র্য ও প্রকাশভঙ্গিতে নতুন সংজ্ঞা যোগ করছেন, তাদেরকে এই বিশেষ আয়োজনে স্বাগত জানানো হয়েছে। এই বর্ণনার ভেতরেই বোঝা যায়, ‘রইদ’-কে শুধু একটি দেশের ছবি হিসেবে নয়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ছবি হিসেবেই দেখছে উৎসব।
‘রইদ’-এর গল্পটা আপাতদৃষ্টিতে সহজ, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক স্তর। গল্পের কেন্দ্রে সাদু নামের এক ব্যক্তি, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। সাদুর স্ত্রী মানসিক সমস্যায় জর্জরিত, এই চরিত্রে আছেন নাজিফা তুষি। স্ত্রীর আচরণ যখন সাদুর কাছে অসহ্য ঠেকে, তখন তিনি তাকে দূরে কোনো এক জেলায় ফেলে আসেন। কিন্তু ঠিকানা চিনে মেয়েটি বারবার স্বামীর ঘরে ফিরে আসে। ফিরে এসে নিখোঁজ থাকার সময়টা তার আর মনে থাকে না, ফলে তারা আবার সংসার শুরু করে। এই ফেরা আর ফেলে আসার চক্রের ভেতর দিয়েই এগোয় ছবিটি।
পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের আগের ছবি ‘হাওয়া’ সমুদ্রের গল্প বলেছিল, আর ‘রইদ’ বলছে রোদের তপ্ত মাটির গল্প। গ্রামীণ বাংলার আবহ, তালগাছ, মাঠ আর প্রকৃতির রুক্ষ সৌন্দর্য ছবিটির ক্যানভাসজুড়ে আছে। সমালোচকদের মতে, আপাত সহজ গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রূপক আর লোকজ পুরাকথার ছোঁয়াই ‘রইদ’-কে অন্য দেশি সিনেমার চেয়ে আলাদা করেছে। সাদুর চরিত্রের একাকিত্ব আর তার স্ত্রীর চরিত্রের রহস্যময় উপস্থিতি মিলে ছবিটি হয়ে উঠেছে আদিম প্রেম আর মানবিক টানাপোড়েনের এক রূপক।
‘রইদ’-এ আরও অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত ও আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ অনেকে। গেল কোরবানির ঈদে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে ছবিটি দারুণ ব্যবসাও করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা পোস্ট। মুক্তির পর থেকেই নাজিফা তুষির অভিনয় বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল। দর্শক আর সমালোচক দুই মহলেই তার চরিত্রটি নিয়ে কথা হয়েছে।
গোয়ার আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘রইদ’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগেই। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে কানাডার মোজাইক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একসঙ্গে তিনটি পুরস্কার জিতেছিল সিনেমাটি। সেরা অভিনেত্রী, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি ও সেরা মিউজিক, এই তিন বিভাগেই পুরস্কৃত হয়েছিল ‘রইদ’। এর আগে ৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিল ছবিটি। অর্থাৎ অস্কারের দৌড় থেকে শুরু করে গোয়ার উৎসব, একের পর এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছে ‘রইদ’।
বাংলাদেশের সিনেমার জন্য এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝা কঠিন নয়। আইএফএফআই ভারতের সবচেয়ে পুরোনো উৎসবগুলোর একটি, যেখানে বিশ্বের নানা দেশের ছবি দেখেন দর্শক, সমালোচক আর পরিবেশকরা। সেখানে ‘ইমার্জিং ফিল্মমেকারস’ বিভাগে জায়গা পাওয়া মানে নতুন নির্মাতাদের কাজ বিশ্বদরবারে তুলে ধরার সুযোগ। বাংলাদেশের গল্প, গ্রামীণ জীবন আর লোকজ আবহ নিয়ে তৈরি একটি ছবি যখন এমন মঞ্চে পৌঁছায়, তখন সেটা শুধু একটি ছবির সাফল্য থাকে না, দেশের সিনেমার পরিচয়ও বড় হয়।
এরপর কী হবে, সেদিকে এখন চোখ থাকবে দর্শকদের। ২০ নভেম্বর গোয়ায় উৎসব শুরু হলে ‘রইদ’-এর প্রদর্শনী ঘিরে আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া জানা যাবে। উৎসবে ছবিটি কেমন সাড়া পায়, সেটাই ঠিক করবে ‘রইদ’-এর পরের যাত্রাপথ। আর যারা এখনো ছবিটি দেখেননি, তাদের জন্য এই খবরটা একটা নতুন করে খোঁজ নেওয়ার কারণও বটে।
