তামিল সিনেমার বক্স অফিসের ইতিহাস লিখতে গেলে বারবার একটাই নাম ফিরে আসে, রজনীকান্ত। ২০০৭ সালে তাঁর অভিনীত শিবাজি: দ্য বস মুক্তি পায়, আর সেটিই তামিল সিনেমাকে বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি রুপির বক্স অফিস ক্লাবে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। উনিশ বছর পর, ৭৫ বছর বয়সে, এই সুপারস্টারই তামিল ইন্ডাস্ট্রির বক্স অফিসের সর্বোচ্চ মানদণ্ড আরও উঁচুতে তুলেছেন।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৩ দিনে জেলার টু সিনেমা বিশ্বব্যাপী ৭৪৪ কোটি রুপি গ্রস আয় করেছে। এর মধ্য দিয়ে সিনেমাটি ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রজনীকান্তের ব্লকবাস্টার ২.০ এর রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে। তামিল সিনেমা প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী ৭০০ কোটি রুপি আয়ের গণ্ডি পেরিয়েছে, আর সেই মাইলফলকের নায়কও সেই একই মানুষ, যিনি ১০০ কোটির যাত্রাটা শুরু করেছিলেন।
মাইলফলকগুলো একসঙ্গে সাজালে ছবিটা আরও চমকপ্রদ লাগে। শিবাজি: দ্য বস ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাপী ১৫০ কোটি রুপি আয় করে ১০০ কোটির ক্লাব খুলে দেয়। এন্থিরান ২০১০ সালে ২৯০ কোটি রুপি আয় করে ২০০ কোটির ক্লাবে পৌঁছায়। ২.০ ২০১৮ সালে ৬৯১ কোটি রুপি আয় করে একসঙ্গে ৩০০, ৪০০, ৫০০ ও ৬০০ কোটির ক্লাব পেরিয়ে যায়। আর জেলার টু ২০২৬ সালে ১৩ দিনে ৭৪৪ কোটি রুপি আয় করে ৭০০ কোটির ক্লাব গড়ে। প্রতিটি ধাপেই রজনীকান্ত, এটাই এই রেকর্ডের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব।
বক্স অফিসের অঙ্কের বাইরেও এই যাত্রার একটা বড় গল্প আছে। একসময় সিনেমার সাফল্য বিচার করা হতো প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমা কত দিন চলল, তার ভিত্তিতে। এখন মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তের আয়, বিদেশি বাজার এবং একাধিক ভাষায় মুক্তির মাধ্যমে শত শত কোটি রুপি উপার্জন সম্ভব। এই পরিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়েই রজনীকান্তের সিনেমাগুলো দেখিয়েছে, তামিল সিনেমা কীভাবে আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে এবং নিজের বাণিজ্যিক পরিসর আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বিদেশের বাজারের গল্পটা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের আয় যখন সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেওয়া শুরু করেনি, তারও অনেক আগে বিদেশের বাজারে ইতিহাস গড়তে শুরু করেছিলেন রজনীকান্ত। ১৯৯৮ সালে তাঁর অভিনীত মুতু জাপানের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর এমন দর্শকদের মন জয় করে, যারা প্রচলিত তামিলপ্রবাসী দর্শকগোষ্ঠীর অংশ ছিলেন না। সেই অপ্রত্যাশিত সাফল্য দিয়েই শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক যাত্রা, যা পরে উত্তর আমেরিকা, উপসাগরীয় অঞ্চল, মালয়েশিয়া এবং আরও অনেক দেশে বিস্তৃত পরিবেশনা ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
জেলার টু এর বিদেশি আয়ের হিসাব সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে। ২.০ বিদেশের বাজার থেকে আয় করেছিল প্রায় ১৭২ কোটি রুপি। জেলার সেই আয়ের অঙ্ক বাড়িয়ে নিয়ে যায় ১৯৬ কোটি রুপিতে। আর জেলার টু মাত্র ১৩ দিনে বিদেশের বাজার থেকে আয় করেছে ২৫৭ কোটি রুপি, যা বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির মোট আয়ের ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশের বাজার এখন আর কেবল অতিরিক্ত আয়ের উৎস নয়, বরং রজনীকান্তের বাণিজ্যিক সাফল্যের কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
জেলার টু এর সাফল্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ আরও একটি কারণে। ২.০ এর মতো বিপুল পরিমাণ হিন্দি ভাষার প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক আয়ের ওপর এই সিনেমাকে নির্ভর করতে হয়নি। বাজারের ভিন্ন সমীকরণ কাজে লাগিয়ে রজনীকান্ত বিশ্বব্যাপী আয়ের এই মাইলফলক অর্জন করেছেন। তেলুগুভাষী অঞ্চলে তাঁর দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা, কর্নাটক ও কেরালায় তাঁর সিনেমার প্রতি শক্তিশালী প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক সমর্থনের কারণে তাঁর বাণিজ্যিক দর্শকগোষ্ঠী তামিলনাড়ুর সীমানা অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত সময়ের ব্যবধান। ২.০ বিশ্বব্যাপী ৬৯১ কোটি রুপি আয়ের যে রেকর্ড গড়েছিল, তা প্রায় আট বছর ধরে কোনো তামিল সিনেমা ভাঙতে পারেনি। এই সময়ে ভারতীয় সিনেমার জগতে টিকিটের দাম, প্রিমিয়াম ফরম্যাট, সিনেমা পরিবেশনের কৌশল এবং দর্শকদের প্রত্যাশায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তবু শেষ পর্যন্ত রেকর্ডটি ভেঙেছে রজনীকান্তেরই আরেকটি সিনেমা। পরবর্তী প্রজন্মের তারকাদের যুগেও বাণিজ্যিক সাফল্যের সর্বোচ্চ অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।
তবে এই তুলনার একটা সতর্কতাও মনে রাখা জরুরি। মূল্যস্ফীতি, টিকিটের দাম বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ২০০৭ সালের ১০০ কোটি রুপির সঙ্গে আজকের ৭০০ কোটি রুপির সরাসরি তুলনা করা যায় না। তবু বৃহত্তর সাফল্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই। দীর্ঘদিন প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা চলার যুগ থেকে মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে বিপুল আয় এবং বিশ্বব্যাপী মুক্তিনির্ভর বাণিজ্যের যুগ, সময়ের এই পরিবর্তনের মধ্যেও রজনীকান্ত এমন বিপুলসংখ্যক দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানতে সক্ষম হয়েছেন, যে ধারাবাহিকতা খুব কম তারকাই এত দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখতে পেরেছেন। এক অর্থে, রজনীকান্তের বক্স অফিস সাফল্যের বিবর্তন তামিল সিনেমার বাণিজ্যিক বিকাশেরই প্রতিচ্ছবি।
