বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

সিনেমা

১৮ বছর আগে প্রায় সব হারিয়েছিলেন নমিত মালহোত্রা, এখন বানাচ্ছেন ৪ হাজার কোটির রামায়ণ: গ্যারেজ থেকে হলিউডের গল্প

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৯ অক্টোবর ২০২৬7 মিনিটে পড়ুন
নমিত মালহোত্রার রামায়ণ প্রকল্প নিয়ে গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

মুম্বাইয়ের একটি গ্যারেজে বসে ১৯ বছর বয়সে একটি অ্যাপল কম্পিউটার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন নমিত মালহোত্রা। সঙ্গে ছিলেন তিন শিক্ষক। সেই ছোট উদ্যোগ থেকে গড়ে উঠেছে অস্কারজয়ী ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডিএনইজি। আর এবার সেই মানুষটিই বাজি ধরেছেন ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের ওপর, যে প্রকল্পের দুই পর্বের বাজেট নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৪ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির কাছাকাছি অঙ্কের কথা বলা হচ্ছে। প্রথম আলোর ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই গল্প, গ্যারেজের শুরু থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের মঞ্চ পর্যন্ত।

নমিতের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে পরিচয় গ্যারেজে ব্যবসা শুরুরও আগে। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল পরিচিত জগৎ। তাঁর বাবা নরেশ মালহোত্রা ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক, আর দাদা এম এন মালহোত্রা ছিলেন চিত্রগ্রাহক। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার নানা দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে পরিবারের পরিচিতির ওপর নির্ভর করে প্রচলিত পথে প্রযোজক হওয়ার বদলে নমিত বেছে নেন চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে থাকা প্রযুক্তি ও কারিগরি কাজকে। সেই পছন্দই পরে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে।

১৯৯৫ সালে ভিডিও ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের শুরু। কম্পিউটার গ্রাফিকস ও সম্পাদনার কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রের পোস্ট প্রোডাকশনেও যুক্ত হয়। নিজের বাবার প্রতিষ্ঠান ভিডিও ওয়ার্কসের সঙ্গে ব্যবসা একীভূত করার পর ১৯৯৭ সালে তৈরি হয় প্রাইম ফোকাস। ভারতের বিনোদনশিল্পে তখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছিল, আর সেই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন নমিত। শুধু সম্পাদনা বা গ্রাফিকসের কাজ করেই থেমে থাকেননি, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও ব্যবসাকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রাইম ফোকাস ভারতের অন্যতম বড় স্বাধীন মিডিয়া সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, আর ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের শেয়ারবাজারেও তালিকাভুক্ত হয়।

নমিতের সাফল্যের পেছনে ছিল বড় ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। ব্যবসা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই উন্নত পোস্ট প্রোডাকশন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আয় তখন তুলনামূলক সীমিত থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি কেনার জন্য তিনি বড় অঙ্কের ঋণ নেন। সেই বিনিয়োগের জন্য পরিবারের সম্পত্তিও ঝুঁকিতে পড়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ নেন তিনি। যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকায় প্রাইম ফোকাসের কার্যক্রম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডাবল নেগেটিভের সঙ্গে প্রাইম ফোকাসের একীভূতকরণ ছিল সেই যাত্রার বড় মোড়। এর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ডিএনইজি।

তবে এই পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। নমিত নিজেই জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ তাঁকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় নিজের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার ব্যবসা বিস্তার করেন। একসময় মুম্বাইয়ের গ্যারেজে শুরু হওয়া উদ্যোগ পরিণত হয় বিভিন্ন মহাদেশে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। প্রথম আলোর শিরোনামে যে ১৮ বছর আগের ক্ষতির কথা বলা হয়েছে, তা এই ২০০৮ সালের সংকটেরই দিকে ইঙ্গিত করে।

ডিএনইজির সাফল্য শুধু একটি বা দুটি ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টারস্টেলার, এক্স মাকিনা, ব্লেড রানার ২০৪৯ ও ফার্স্ট ম্যানের মতো সিনেমাতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে। জটিল কল্পবিজ্ঞান, মহাকাশ, ভবিষ্যতের নগর কিংবা বাস্তবে ধারণ করা কঠিন দৃশ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। ডিএনইজির বিভিন্ন কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি মোট আটটি একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি পুরস্কার এসেছে গত ১১ বছরে।

ডিএনইজিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার নমিতের মনোযোগ ভারতীয় পুরাণের অন্যতম পরিচিত কাহিনি রামায়ণে। তবে এই প্রকল্পকে তিনি নিছক আরেকটি বড় বাজেটের ভারতীয় সিনেমা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর লক্ষ্য, এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, যা ভারতীয় দর্শকের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশের দর্শকের কাছেও আবেদন তৈরি করবে। সিনেমাটি দুই পর্বে নির্মিত হচ্ছে। পরিচালনায় নীতেশ তিওয়ারি, যিনি দঙ্গল ও ছিছোরের মতো সিনেমার জন্য পরিচিত। রামের চরিত্রে রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী, রাবণের চরিত্রে যশ, হনুমানের চরিত্রে সানি দেওল ও লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবে অভিনয় করছেন।

প্রকল্পটির ব্যাপ্তি বোঝা যায় এর বাজেটের হিসাব থেকেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুই পর্ব মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির কাছাকাছি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্ক নিয়ে প্রতিবেদনভেদে পার্থক্য রয়েছে। কিছু হিসাব কেবল নির্মাণব্যয়কে বিবেচনায় নিয়েছে, অন্যগুলোয় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, প্রযুক্তি, সংগীত, বিপণন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের খরচও অন্তর্ভুক্ত। তাই পুরো প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এই সতর্কতাটা মনে রাখা জরুরি, কারণ ৪ হাজার কোটি সংখ্যাটি এখন অনেক জায়গায় নিশ্চিত অঙ্কের মতো ঘুরছে, অথচ প্রথম আলোর প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, হিসাবের পদ্ধতিভেদে অঙ্ক বদলে যেতে পারে।

রামায়ণের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ভারতীয় ও পশ্চিমা চলচ্চিত্রশিল্পের দক্ষতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো। সিনেমাটির সংগীত পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন অস্কারজয়ী এ আর রাহমান ও হ্যান্স জিমার। হলিউডের একাধিক বড় প্রযোজনায় কাজ করা জিমারের সঙ্গে রাহমানের এই সহযোগিতা প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক আকর্ষণ বাড়িয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্য নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন টেরি নোটারি ও গাই নরিস। আর প্রাচীন ভারতের পরিবেশ, নগর, প্রাসাদ ও বিস্তৃত ভূদৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে কাজ করছেন প্রোডাকশন ডিজাইনারদের একটি আন্তর্জাতিক দল। সিনেমাটি আইম্যাক্সে মুক্তির উপযোগী করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের দায়িত্বে রয়েছে ডিএনইজি ও রিডিফাইন। নমিতের পরিকল্পনায় এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু দৃশ্যের জাঁকজমক বাড়ানো নয়, বরং গল্পের আবেগ ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে ভিন্ন সংস্কৃতির দর্শকেরাও চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন।

সেই স্বপ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে সিনেমাটির বিশেষ উপস্থাপনা। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাডেমি মিউজিয়াম অব মোশন পিকচার্সের ডেভিড গেফেন থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নমিত নিজের দীর্ঘ যাত্রার কথা তুলে ধরেন। একে তিনি তুলনা করেন ব্যক্তিগতভাবে অস্কার পাওয়ার মুহূর্তের সঙ্গে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অর্জন, পারিবারিক সমর্থন এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল তাঁর কাছে এক আবেগঘন উপলক্ষ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিনেমাটির পরিচালক ও প্রধান অভিনয়শিল্পীরা। নিজের বক্তব্যে তিনি মা বাবা, স্ত্রী, সন্তান, সহকর্মী এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নমিত বলেছেন, প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার পর তিনি নিজেকে এই মাত্রার একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রস্তুত মনে করছেন। তাঁর লক্ষ্য, বাজেট বা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার অজুহাত না দিয়ে ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের বড় বড় প্রযোজনার পাশে দাঁড় করানো।

নমিত মালহোত্রার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প যতটা অনুপ্রেরণার, রামায়ণ প্রকল্পটি ততটাই বড় পরীক্ষা। কারণ, বিপুল বিনিয়োগ, তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী ও বিশ্বমানের কারিগরি দল থাকলেই কোনো সিনেমা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে পরিচিত ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মহাকাব্যকে নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ভারতে রামায়ণের একাধিক টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র সংস্করণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে নতুন সংস্করণটির সামনে একদিকে রয়েছে পরিচিত গল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে পুরোনো সংস্করণের সঙ্গে তুলনার চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারেও সিনেমাটিকে এমন দর্শকের মন জয় করতে হবে, যাঁদের অনেকের কাছেই কাহিনিটি নতুন। প্রথম পর্বের মুক্তি ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর নির্ধারিত বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব আসার কথা ২০২৭ সালে, দীপাবলির সময়। ৫ নভেম্বর আর মাত্র কয়েক দিন দূরে, তাই এই প্রযোজকের গল্প এখন শুধু অতীতের সাফল্য নয়, সামনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার প্রস্তুতিও বটে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন