চলচ্চিত্রের সেটে অভিনেত্রীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা নতুন নয়, কিন্তু সেটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস সবাই দেখান না। এবার সেই সাহস দেখিয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে। নিজের নতুন সিরিজ আক্কার প্রচারে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, একটি অ্যাকশন সিনেমায় অন্তর্বাস পরে দৃশ্যে অভিনয় করার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি অন্তর্বাস ছাড়া শার্ট পরা ও শার্টের বোতাম খোলা রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
রাধিকার প্রশ্নটি ছিল সরল, কিন্তু ধারালো। এমন নির্দেশনার পেছনে যুক্তি কী, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয় করার সময় শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, পর্দার আকর্ষণ বাড়ানোর নামে অভিনেত্রীর স্বস্তিকে উপেক্ষা করা যায় না। তাঁর ভাষায়, নির্দেশদাতাদের তিনি পদার্থবিদ্যার বিষয়টা একটু ভেবে দেখতে বলেছিলেন। এই এক লাইনেই সেটে অভিনেত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনেক অযৌক্তিক প্রত্যাশার ছবি ফুটে উঠেছে।
শুধু নিজের অভিজ্ঞতাতেই থেমে থাকেননি রাধিকা। তিনি জানিয়েছেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্বস্তি ও সম্মতি নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ইন্টিমেসি কোঅর্ডিনেটরদেরও কখনো কখনো পেশাগত ঝুঁকিতে পড়তে হয়। অনুচিত দাবি বা নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁদের চাকরি হারানোর ঘটনাও তিনি দেখেছেন। অর্থাৎ সমস্যাটি একক কোনো ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়, সেটে ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন বলিউডে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে পরিবর্তনের কথা আলোচনায় রয়েছে। কিছুদিন আগেই এই সাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে হাত কোথায় থাকবে, তা ঠিক করার মতো পেশাদার ভূমিকার গুরুত্ব বাড়ছে। রাধিকার বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করল, কারণ তিনি দেখিয়ে দিলেন, নিয়ম থাকলেও সেটে সেই নিয়ম মানাতে গিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের ওপর চাপ আসতে পারে।
রাধিকা আপ্তে চলচ্চিত্রশিল্পের নানা অসংগতি নিয়ে আগেও সরব হয়েছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভিন্নধর্মী, সাহসী চরিত্র। বাণিজ্যিক সাফল্যের চাপে নিজের অবস্থান থেকে সরে না আসার জন্য তিনি পরিচিত। এবারের সাক্ষাৎকারেও সেই ধারাবাহিকতাই দেখা গেল। তিনি কোনো সিনেমার নাম উল্লেখ করেননি, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগও তোলেননি, বরং সেটের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ভঙ্গিটাই তাঁর বক্তব্যকে ব্যক্তিগত অভিযোগের চেয়ে বড়, শিল্পজুড়ে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
যে সিরিজের প্রচারে এসে তিনি এসব কথা বললেন, সেই আক্কা নিয়ে আগ্রহও এখন তুঙ্গে। নেটফ্লিক্সে আসন্ন এই ভারতীয় সিরিজে নারীদের শাসনে চলা একটি কাল্পনিক রাজ্যের গল্প বলা হয়েছে। ১৯৮০ এর দশকের দক্ষিণ ভারতের কাল্পনিক শহর পেরুনুরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গল্পটি, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্ষমতা ধরে রেখেছে এক নারী গ্যাংস্টারদের গোষ্ঠী। সেই রাজত্বে হঠাৎ হাজির হয় এক বহিরাগত, যার উপস্থিতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা বদলে দিতে পারে ক্ষমতার সমীকরণ।
সিরিজের দুই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ভবানী ও রুদ্র। ভবানী চরিত্রে অভিনয় করেছেন কীর্তি সুরেশ, আর রুদ্রর ভূমিকায় রয়েছেন রাধিকা আপ্তে। আনুগত্য, প্রতিশোধ, পারিবারিক উত্তরাধিকার আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গল্প নিয়ে তৈরি আক্কা ৩০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে আসছে বলে এর আগে জানা গিয়েছিল। অর্থাৎ রাধিকার এই সাক্ষাৎকার মুক্তির ঠিক আগের মুহূর্তে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করল।
রাধিকার বক্তব্যের পর এখন প্রশ্ন উঠছে, সেটে অভিনেত্রীদের স্বস্তি ও সম্মতির প্রশ্নটি কি শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কাজের নিয়মে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, ক্যামেরার সামনে যতই শক্তিশালী চরিত্রে দেখা যাক, ক্যামেরার পেছনে অনেক অভিনেত্রীকেই অস্বস্তিকর নির্দেশের মুখোমুখি হতে হয়। এই সত্যিটা প্রকাশ্যে আসাই হয়তো পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
