বিনোদন ঝলক
সিনেমা

আড়াই কোটির 'প্রেমাদা উরাল্লি' ১১০ কোটি ছাড়াল: ফিরিয়ে দেওয়া প্রযোজকরাই এখন পরিচালকের দেখা চান

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৫ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
'প্রেমাদা উরাল্লি' ১১০ কোটি ছাড়ানো সংক্রান্ত গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

কন্নড় সিনেমা 'প্রেমাদা উরাল্লি'র সাফল্যের গল্পটা যেন সিনেমারই গল্প। মাত্র আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা বাজেটে বানানো ছবিটি বক্স অফিসে ১১০ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম আলোর ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এই নতুন অঙ্ক জানানো হয়েছে। অথচ একসময় এই ছবিটি মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছিল নির্মাতাদের। কেউ বিনিয়োগে রাজি হননি, মুক্তির দিন শেষ মুহূর্তে কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনী বাতিলও হয়েছিল। সেই ছবিই এখন কন্নড় চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক চমক।

সবচেয়ে মজার মোড়টা এসেছে এখন। নির্মাতাদের দাবি, ছবিটি ফিরিয়ে দেওয়া প্রযোজকেরাই এখন পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী। এই অবিশ্বাস্য যাত্রার কথা সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী স্ক্রিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ছবির চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত এস কে। তাঁর ভাষ্য, এক প্রভাবশালী প্রযোজককে আগেই সতর্ক করেছিলেন তিনি, বলেছিলেন ছবিটি ফিরিয়ে দিলে একদিন অনুতাপ করতে হবে। মুক্তির পর ছবিটি আলোচনায় আসতেই সেই প্রযোজক পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে তাঁকে ফোন করেন। রাজকান্তের দাবি, একসময় যাঁরা ছবিটিতে অর্থ লগ্নি করতে চাননি, তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত।

ছবির পরিচালক মনোজ কুমারের নিজের জীবনও কম নাটকীয় নয়। তাঁর প্রথম ছবি 'অক্ষি' জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল। কিন্তু সেই স্বীকৃতির পরও দীর্ঘ পাঁচ বছর নতুন কাজ পাননি তিনি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ছবিটি বানাতে গিয়ে তাঁকে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। একপর্যায়ে শুটিং শেষ করার টাকা জোগাড় করতে মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। একজন জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালকের এই অবস্থা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের কঠিন বাস্তবতাটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: পুরস্কার থাকলেই পরের ছবির টাকা জোটে না।

টাকার গল্পটা আরও চমকপ্রদ। ছবিটি তৈরির শুরুতে বাজেট ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। পরে শুটিং ও অন্যান্য খরচ বাড়তে থাকায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। কেউ ১০ লাখ, কেউ ২০ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন বিনিয়োগকারী ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানিয়েছেন রাজকান্ত। বাজেট কম হলেও নির্মাণের মান নিয়ে আপস করতে চাননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত নিজের পরিচিতির সূত্র কাজে লাগিয়ে ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়ায় ছাড় আদায় করেন। যে সরঞ্জাম ভাড়া করতে দিনে ৩০ হাজার টাকা লাগত, তা পাওয়া যায় ১৫ হাজার টাকাতে। শতাধিক সদস্যের শুটিং দলকে আবাসনের জন্য আলাদা হোটেলে না রেখে ভাড়া করা অনুষ্ঠানস্থলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, অভিনেতাদের জন্য অবশ্য আলাদা আবাসন ছিল।

সিনেমা বানানোর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মুক্তি ও প্রচার। বড় তারকা না থাকায় ছবিটির প্রতি প্রযোজকদের আগ্রহ ছিল কম, মুক্তির প্রচারণার জন্যও হাতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। তখন পরিচালক মনোজ কুমার বেছে নেন ব্যতিক্রমী এক কৌশল। ছবিটি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপানো হয়। বাস, ট্রেন, বাসস্ট্যান্ড, মন্দির ও জনসমাগমের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের হাতে সেই কার্ড তুলে দেন নির্মাতারা। তাঁদের অনুরোধ ছিল একটাই, অন্তত একবার যেন দর্শকেরা ছবিটি দেখেন। পাশাপাশি কর্ণাটকের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার পেছনে লাগানো হয় আলোকপ্রতিফলক স্টিকার। ১০ হাজারের বেশি স্টিকার ছাপিয়ে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন রাজকান্ত। প্রচারের এই পদ্ধতি ছবিটির সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি করে, যেটা কোটি টাকার বিজ্ঞাপনও অনেক সময় পারে না।

মুক্তির শুরুর চিত্রটা ছিল হতাশাজনক। ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় 'প্রেমাদা উরাল্লি'। প্রথম দিন ছবিটি মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করে। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকেই দর্শকের আগ্রহ বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং দর্শকদের মুখে মুখে ছবিটির প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ায় বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা। বক্স অফিসের হিসাব নিয়ে কাজ করা স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহে ছবিটির দৈনিক আয় কয়েক কোটি রুপিতে পৌঁছে যায়, তৃতীয় সপ্তাহেও সেই গতি বজায় ছিল। সিনেমা এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, মুক্তির ১৩ দিনের মধ্যে ছবিটির আয় ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, পরে তা ১১০ কোটি টাকার বৈশ্বিক আয়ের মাইলফলক অতিক্রম করে।

তবে বক্স অফিসের অঙ্ক নিয়ে একটা সতর্কবার্তাও আছে, যেটা প্রথম আলো নিজেই দিয়েছে। স্যাকনিল্কের ২৪ অক্টোবরের হালনাগাদ তথ্যে ছবিটির বিশ্বব্যাপী আয় ১১৫ কোটি টাকার বেশি দেখানো হয়েছে, অন্যদিকে ১১০ কোটি টাকার বেশি আয়ের হিসাবও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এসব পরিসংখ্যান প্রাথমিক অনুমাননির্ভর হতে পারে, নির্মাতাদের আনুষ্ঠানিক হিসাবের সঙ্গে পার্থক্য থাকা অসম্ভব নয়। অর্থাৎ ১১০ কোটি ছাড়ানো নিশ্চিত হলেও ঠিক কত কোটি, সেটা নিয়ে ট্র্যাকারভেদে কিছুটা ফারাক আছে, পাঠকের সেটা জেনে রাখা ভালো।

'প্রেমাদা উরাল্লি' মূলত গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের গল্প। ছবিতে নাগান্নার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঙ্গায়ন রঘু, ছেলেকে নিয়ে গ্রামে তাঁর সংসার। ছেলের জন্য শিক্ষিত পুত্রবধূ খুঁজতে গিয়ে পরিবারে তৈরি হয় নানা জটিলতা। ছেলের চরিত্রে আছেন শ্রী রাম, এ ছাড়া অভিনয় করেছেন রামিকা শিবু ও তাপস্বিনী পুনাচ্চা। ছবির গল্পে প্রেমের পাশাপাশি কৃষিজীবন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন উঠে এসেছে। কর্ণাটকের হাসান অঞ্চলের সবুজ প্রকৃতি ছবিটির দৃশ্যায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত জানিয়েছেন, বর্ষার আবহকে ছবির আবেগের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁরা।

'প্রেমাদা উরাল্লি'র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ছবিটির সাফল্যের জন্য বড় তারকা কিংবা বিপুল প্রচার ব্যয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়নি নির্মাতাদের। শুরুতে মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী পাওয়া একটি ছবি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত প্রদর্শনীতে পৌঁছে যায়। দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই প্রেক্ষাগৃহমালিক ও পরিবেশকদের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে। একসময় যে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করাই ছিল কঠিন, সেটিই এখন প্রযোজকদের আগ্রহের কেন্দ্রে। বাংলাদেশের দর্শকের জন্যও এই গল্পে একটা বার্তা আছে: ভালো গল্প আর দর্শকের মুখের কথার সামনে বাজেটের অঙ্কটা শেষ পর্যন্ত গৌণ হয়ে যায়।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার