মাত্র আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিষেক, এরপর তিন যুগ ধরে একের পর এক দর্শকনন্দিত সিনেমা। ২৯৯টি ছবিতে অভিনয়, ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আজীবন সম্মাননা। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের অনন্য জায়গা তৈরি করে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ক্যামেরার সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন নায়িকা শাবানা। পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘদিনের কর্মজীবন, সহশিল্পী ও অগণিত ভক্তকে ফেলে যাওয়ার সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খুলেছেন মুখ এই বরেণ্য অভিনয়শিল্পী। তাঁর মতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং মা হিসেবে তাঁদের পাশে থাকার তাগিদ থেকেই অভিনয় ছেড়েছিলেন তিনি।
পুরো নাম আফরোজা সুলতানা রত্না হলেও বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তিনি শাবানা নামেই পরিচিত। বাবা ফয়েজ চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম আদালতপাড়ার টাইপিস্ট, মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। ষাটের দশকের শুরুতে এহতেশাম পরিচালিত 'নতুন সুর' ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু, তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে এহতেশামই একদিন শাবানার বাবাকে বলেছিলেন, মেয়েটাকে একটি ছবিতে নিতে চান। শাবানার বাবা তখন নাকি এভাবেই বলেছিলেন, রত্না কীভাবে অভিনয় করবে, সে এত লাজুক যে কারও সামনেই আসতে চায় না। কিন্তু নাছোড়বান্দা এহতেশাম বলেছিলেন, রত্নার মতো একটা মেয়েই তিনি খুঁজছেন। শেষ পর্যন্ত বাবা রাজি হন। ওই ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন রহমান ও রওশান আরা।
সেই সময়ের কথা মনে করে শাবানা প্রথম আলোকে বলেছেন, ছবিতে তাঁর প্রথম দৃশ্য ছিল এমন, খুশিতে দৌড়ে এসে বলবেন, ভাইয়া ভাইয়া, আপুর বিয়ে। তাঁকে জড়িয়ে ভাইয়া বলবেন, তাই নাকি রে। প্রথমবারেই শট ওকে হয়ে যায়। তার পর থেকে মায়ের চেয়ে বাবাই সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। মজার বিষয় হলো, যে বাবা প্রথমে রত্নাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দিতে চাননি, পরবর্তীতে সেই বাবাই হয়ে ওঠেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। শাবানার বাবা পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের উৎসাহে নিজেও পরিচালনা করেন। তাঁর পরিচালিত ছবির মধ্যে 'মুক্তি', 'মালকাবানু', 'বিজয়িনী সোনাভান', 'আলতাবানু' ও 'রাজার মেয়ে বেদিনী' উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে 'মালকাবানু' ছিল সুপারহিট, যার গানগুলো এখনো মানুষ গায়।
১৯৬৭ সালে একই পরিচালকের উর্দু ছবি 'চকোরী'তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শাবানা। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা। নায়িকা থেকে ভাবি, মা, বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিনয়জীবনের ২৯৯টি ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ১৩০টিতে জুটি হয়েছিলেন আলমগীরের সঙ্গে। এরপর যাঁর সঙ্গে জুটি হয়ে বেশি অভিনয় করেছেন, তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। ১৯৭২ সালে নির্মিত রাজ্জাক-শাবানা জুটি অভিনীত কাজী জহিরের 'অবুঝ মন' ছবিটি দারুণ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল।
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি শাবানার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের পেশা ও চেনা জগৎ ছেড়ে যাওয়ার পেছনে ছিল সন্তানদের নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঠিকঠাকভাবে করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান। সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থেকে তাঁদের বেড়ে ওঠার সময়টুকু হারাতে চাননি শাবানা। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, 'মা হিসেবে আমার তো কিছু দায়িত্ব আর কর্তব্য আছে। সন্তানদের যদি ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমার এই অভিনয়জীবন দিয়ে কী হবে। তাই কষ্ট হলেও সিনেমা ছেড়ে সন্তানদের ব্যাপারে মনোযোগী হলাম।'
সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে শাবানাকে তাঁর প্রযোজক স্বামী ওয়াহিদ সাদিক বেশ সহযোগিতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ব্যবসার সুযোগ ছিল। তাই পরিবারের সঙ্গে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন শাবানা। শাবানার মতে, 'সাদিক সাহেবও ওখানে কিছু ব্যবসার ব্যবস্থা করলেন। আমিও দেখলাম, অনেক দিন তো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলাম, এবার ঘরের দিকে মনোযোগী হই। তাই চলে গেলাম।' তবে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিও তাঁর কাছে একটা পরিবারের মতো ছিল। সেখানে তিনি রাতদিন অবসরবিহীন কাজ করেছেন। সহশিল্পী, পরিচালকদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কাউকে ভাই, আবার কাউকে চাচা ডাকতেন তিনি।
সন্তানদের জন্য নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পর কেটে গেছে বহু বছর। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ শেষ করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি করছেন। তিনিও বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। সন্তানদের পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা শাবানার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি। শৈশব থেকেই অভিনয়ে যুক্ত থাকায় নিজের জন্য সময় বের করার সুযোগ খুব কমই পেয়েছিলেন তিনি। কাজের প্রতি একাগ্রতা ছিল এতটাই যে অভিনয়ের সময় অন্য সবকিছু ভুলে থাকতেন। একটা পর্যায়ে পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'শৈশবে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হই। নিজেকে দেওয়ার মতো সময় পাইনি। কাজ, কাজ আর কাজ। এভাবেই কেটেছে একটানা ৩৫ বছর। পরিবার ও সন্তানদের সময় দেওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে জরুরি হয়ে পড়ে।'
অভিনয় ছেড়ে দিলেও দেশের চলচ্চিত্রের খোঁজখবর একেবারে অজানা থাকে না শাবানার। যুক্তরাষ্ট্রে বসে ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে যতটুকু পারেন, খোঁজ রাখেন। ঢাকায় থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। স্বামী ওয়াহিদ সাদিক একটি ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা করায় শাকিবের সঙ্গে তাঁদের বাসায় কথা হয়। শাবানার স্মৃতিতে, শাকিব ছিলেন সুদর্শন, ভদ্র ও অমায়িক। কয়েক বছর আগে শাকিব যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে একবার শাবানার নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে ফোনেও কথা হয় শাকিব খানের। দেশের সিনেমা নিয়ে জানতে চাইলে শাকিব খানের নামই বেশি শোনেন বলে জানান শাবানা। তাঁর ভাষায়, 'শাকিব তো অনেকটা সময় ধরে কাজ করছে। শুনছি, এখন বেশ ভালো করছে। তার সিনেমা মুক্তি পেলে আমাদের এখানেও চলে। বিশ্বের আরও দেশে শাকিবের সিনেমা মুক্তি পায়, এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের, গর্বের।'
বিভিন্ন সময়ে নতুন চলচ্চিত্রে শাবানার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম রোকেয়ার জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে বলে শোনা গিয়েছিল। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তাঁর। বয়স বেড়েছে, জীবনের ব্যস্ততাও বদলেছে। এখন পরিবার, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়েই তাঁর সময় কাটে। শাবানা বলেন, 'এই বয়সে আর কীভাবে? এখন তো অনেক বয়স হয়ে গেছে। আল্লাহর নাম নিয়ে পার করে দিচ্ছি সময়। এখন পরিবারটাই আমার জগৎ।'
একসময় শুটিংয়ের ব্যস্ততায় দিনরাত কাটানো শাবানার জীবনে এখন সেই কর্মব্যস্ততা নেই। তবু দর্শকের মন থেকে হারিয়ে যাননি তিনি। টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত সিনেমা প্রচারিত হয়, পুরোনো চরিত্রগুলো নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তোলে। অভিনয়ের ব্যস্ত সময়ে সন্তানদের পাশে থাকার জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা নিয়ে তাঁর মধ্যে আক্ষেপ নেই। বরং জীবনের প্রয়োজন বুঝে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বলেই সন্তুষ্ট এই বরেণ্য অভিনয়শিল্পী।
