দুই দশক আগের জাদুর খেলা আবার ফিরছে বড় পর্দায়, এবার আরও বড় ও ঝকঝকে আয়োজনে। ক্রিস্টোফার নোলানের আলোচিত ছবি ‘দ্য প্রেস্টিজ’ মুক্তির ২০ বছর পূর্তিতে পুনরায় মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ডিজনি। এবারের সবচেয়ে বড় চমক হলো, প্রথমবারের মতো ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্স পর্দায় দেখার সুযোগ পাবেন দর্শক। আগামী ২৯ জানুয়ারি ছবিটি পুনরায় মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
পুনর্মুক্তি নিয়ে এক বিবৃতিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নোলান নিজে। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই উচ্ছ্বসিত যে, ‘দ্য প্রেস্টিজ’ আবারও বড় পর্দায় ফিরে আসছে। বিশেষ করে ৭০ মিলিমিটার ও আইম্যাক্সে প্রথমবারের মতো সিনেমাটি দেখতে পাবে দর্শক, এটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার হতে যাচ্ছে।’
২০০৬ সালের ২০ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিল ‘দ্য প্রেস্টিজ’। ভিক্টোরিয়ান যুগের লন্ডনের পটভূমিতে দুই মঞ্চজাদুকরের দীর্ঘ ও তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এর গল্প। রবার্ট অ্যাঞ্জিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছেন হিউ জ্যাকম্যান, আর আলফ্রেড বোর্ডেনের ভূমিকায় ক্রিশ্চিয়ান বেল। এছাড়া ছবিতে রয়েছেন মাইকেল কেইন, স্কারলেট জোহানসন, রেবেকা হল, অ্যান্ডি সার্কিস এবং উদ্ভাবক নিকোলা টেসলার চরিত্রে সংগীতশিল্পী ডেভিড বোয়ি। ছবিটি নির্মিত হয়েছে ক্রিস্টোফার প্রিস্টের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে।
মুক্তির পর বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল ছবিটি। ৪ কোটি মার্কিন ডলার বাজেটে নির্মিত এই সিনেমা বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। পাশাপাশি দুটি বিভাগে অস্কার মনোনয়নও পেয়েছিল এটি। পরিচালনার পাশাপাশি ভাই জোনাথন নোলানের সঙ্গে যৌথভাবে চিত্রনাট্য লিখেছেন ক্রিস্টোফার নোলান নিজে, আর প্রযোজনায় ছিলেন তার স্ত্রী এমা থমাস ও অ্যারন রাইডার।
দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ছবিটির আবেদন কমেনি, বরং বেড়েছে। জাদু, প্রতারণা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগের গল্পে বোনা এর চিত্রনাট্য এবং শেষ মুহূর্তের চমক নিয়ে আজও আলোচনা হয় সিনেভক্তদের মধ্যে। অনেকের চোখে এটি নোলানের সবচেয়ে পরিণত ও নিখুঁত নির্মাণগুলোর একটি। ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডার্ক নাইট’ ট্রিলজি কিংবা ‘ওপেনহাইমার’র মতো বড় বাজেটের ছবির ভিড়ে ‘দ্য প্রেস্টিজ’ আজও আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে তার বুদ্ধিদীপ্ত ও স্তরে স্তরে সাজানো গল্প বলার জন্য।
এই পুনর্মুক্তিকে সত্যিকারের বিশেষ করে তুলেছে ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্স ফরম্যাট। ফিল্মে ছবি তোলা ও ফিল্ম প্রজেকশনের ঘোর সমর্থক হিসেবে পরিচিত নোলান বরাবরই ডিজিটাল যুগে সেলুলয়েডের পক্ষে সওয়াল করে এসেছেন। তার ‘ওপেনহাইমার’ ছবির বড় অংশ ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল, আর সেই ফরম্যাটে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাকে অনেক সিনেপ্রেমীই প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখার সেরা উপায় বলে মনে করেন। কিন্তু বিশ্বে হাতেগোনা কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহেই এই প্রযুক্তি রয়েছে, ফলে ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্সে কোনো ছবির প্রদর্শনী মানেই সিনেভক্তদের কাছে ছোটখাটো উৎসব।
ক্লাসিক ছবির পুনর্মুক্তি অবশ্য নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু পুরনো জনপ্রিয় ছবি ডিজিটাল রিস্টোরেশন বা বিশেষ ফরম্যাটে আবার প্রেক্ষাগৃহে এনে ভালো সাড়া পেয়েছে। ‘দ্য প্রেস্টিজ’র ক্ষেত্রে ২০ বছর পূর্তির এই আয়োজন সেই ধারারই অংশ, তবে ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্সের মতো প্রিমিয়াম ফরম্যাট যোগ হওয়ায় এর আবেদন আরও বেড়েছে।
এখন প্রশ্ন, কোন কোন দেশের কোন কোন প্রেক্ষাগৃহে এই বিশেষ প্রদর্শনী হবে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। তবে নোলানভক্তদের মধ্যে এরই মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, আর দুই দশক পর প্রিয় ছবিটি নতুন করে বড় পর্দায় দেখার সুযোগ নিয়ে উচ্ছ্বসিত তারা। বাংলাদেশের দর্শকরা এই প্রদর্শনী দেখতে পাবেন কি না, সে বিষয়েও এখনো কোনো তথ্য নেই। বিস্তারিত আপডেট পাওয়া গেলেই জানা যাবে।
ছবির পার্শ্বচরিত্রগুলোও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মাইকেল কেইন অভিনয় করেছেন কাটার চরিত্রে, যিনি মঞ্চের নেপথ্য কৌশলের কারিগর হিসেবে দুই জাদুকরের দ্বন্দ্বের সাক্ষী। স্কারলেট জোহানসন ছিলেন অলিভিয়া ওয়েন্সকম্বের ভূমিকায়, আর সংগীতশিল্পী ডেভিড বোয়ি পর্দায় তুলে ধরেছেন উদ্ভাবক নিকোলা টেসলাকে, যার বৈদ্যুতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা গল্পে রহস্যের নতুন স্তর যোগ করে।
‘ব্যাটম্যান বিগিন্স’ ও ‘দ্য ডার্ক নাইট’র মাঝে ২০০৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘দ্য প্রেস্টিজ’। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির বাণিজ্যিক চাপের বাইরে নির্মিত এই ছবিতেই নোলানের গল্প বলার নিজস্ব ধরন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এরপর ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’ হয়ে ‘ওপেনহাইমার’ পর্যন্ত তার প্রতিটি ছবিতেই ফিল্ম ফরম্যাট ও বড় পর্দার অভিজ্ঞতার প্রতি এই ভালোবাসা দেখা গেছে।
ক্লাসিক ছবির পুনর্মুক্তিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালো সাড়া মিলেছে। ২০২৪ সালে ‘ইন্টারস্টেলার’র দশম বার্ষিকীর পুনর্মুক্তি বিশ্বব্যাপী দর্শক টেনেছিল। ‘দ্য প্রেস্টিজ’র ২০ বছর পূর্তির আয়োজন সেই ধারাবাহিকতায় আরও বড় পরিসরে হতে যাচ্ছে, বিশেষ করে ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্সের মতো প্রিমিয়াম ফরম্যাট যুক্ত হওয়ায়।
