'কী ছিলে আমার, বলো না তুমি': একসময় এই গানের সুরে মুগ্ধ হননি এমন শ্রোতা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। নব্বইয়ের দশকে অডিও অ্যালবামের সোনালি যুগে যাদের কণ্ঠে প্রেম, বিরহ আর অভিমানের গল্প শুনে বড় হয়েছে একটি প্রজন্ম, তাদেরই একজন সংগীতশিল্পী মনি কিশোর। ২০ অক্টোবর ছিল তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী, আর এই দিনে আবারও সামনে এলো তার জীবন আর নিঃসঙ্গ বিদায়ের গল্প।
নব্বইয়ের দশকে অডিও অ্যালবামের জনপ্রিয়তার সময়ে একের পর এক গান দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন মনি কিশোর। 'কী ছিলে আমার', 'সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার', 'তুমি শুধু আমারই জন্য', 'মুখে বলো ভালোবাসি', 'আমি মরে গেলে জানি তুমি': এই গানগুলো তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি। প্রেম, বিরহ, অভিমান আর স্মৃতিময় অনুভূতির প্রকাশ তার গানে আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল, আর এভাবেই গড়ে ওঠে তার নিজস্ব শ্রোতাশ্রেণি। একসময় নব্বইয়ের দশকের আধুনিক গানের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি।
তার সবচেয়ে শ্রোতাপ্রিয় গান 'কী ছিলে আমার' ছিল তার নিজেরই লেখা ও সুর করা। দীর্ঘ সংগীতজীবনে পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন মনি কিশোর। রেডিও ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হলেও চলচ্চিত্রে তার গান গাওয়ার সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। মূলত অডিও অ্যালবামেই বেশি কাজ করেছেন তিনি, আর তার গাওয়া অনেক গান এখনো শ্রোতাদের কাছে নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ।
কিন্তু জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই শিল্পীই একসময় নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ২০০০ সালের পর ধীরে ধীরে সংগীত থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন তিনি, একপর্যায়ে নতুন গান প্রকাশ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন। দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, অনেকটা অভিমান থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। শেষ দিকে তো এমনও হয়েছে, কেউ যাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে, নিজের ব্যবহৃত পুরনো মুঠোফোন নম্বর বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার রামপুরায় টেলিভিশন ভবনের পাশের একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। সেখানে একাই থাকতেন তিনি। বাসা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়, এরপর পুলিশের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে সামনে আসে তার মৃত্যুর খবর। মারা যাওয়ার পর মরদেহ কী করতে হবে, তা তিনি বলে গিয়েছিলেন একমাত্র মেয়ে নিন্তিকে।
বেদনার বিষয় হলো, চলে যাওয়ার ঠিক আগেই ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি আবারও গান করছেন। পুরনো গানগুলো পর্যায়ক্রমে ইউটিউবে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, জনপ্রিয় গান 'কী ছিলে আমার' নতুন করে প্রকাশের পরিকল্পনাও ছিল তার। তার ভাষ্য ছিল, এ প্রজন্মের শ্রোতারাও গানটি শুনেছেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।
মনি কিশোরের গল্প আসলে শুধু একজন গায়কের গল্প নয়, এটি একটি যুগের গল্পও। ক্যাসেট আর সিডির যুগে যারা ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন, ডিজিটাল যুগের ঝড়ে তাদের অনেকেই হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে। অথচ তাদের গান আজও বেঁচে আছে শ্রোতার স্মৃতিতে, ইউটিউবের কমেন্টবক্সে, পুরনো দিনের আড্ডায়। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মনি কিশোরকে স্মরণ করা মানে সেই যুগটাকেও একবার ফিরে দেখা।
