বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজের কথা উঠলে যে কয়টি নাম সবার আগে মনে পড়ে, মহানগর তার মধ্যে একটি। আশফাক নিপুণ নির্মিত এই ক্রাইম থ্রিলার শুধু একটি থানার গল্প নয়, ক্ষমতা, রাজনৈতিক চাপ আর দুর্নীতির মুখে একজন পুলিশ কর্মকর্তার টিকে থাকার গল্প। মোশাররফ করিম এখানে ওসি হারুনের চরিত্রে এমনভাবে মিশে গেছেন যে অনেক দর্শকের কাছে এই চরিত্রটাই সিরিজের পরিচয় হয়ে উঠেছে। প্রথম সিজন মুক্তির পর বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও সিরিজটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল, আর সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এসেছে দ্বিতীয় সিজন। সম্প্রতি হইচই আর নেটফ্লিক্সের চুক্তির খবরে মহানগর আবার আলোচনায় ফিরেছে, কারণ এই চুক্তির আওতায় সিরিজটি হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে বলে জানানো হয়েছে। এই গাইডে মহানগরের গল্প, দুই সিজনের কাঠামো, কাস্ট, দেখার উপায় আর এখনো যা জানা যায়নি, সবকিছু এক জায়গায় সাজানো হলো।
মহানগরের কেন্দ্রে আছে ঢাকার একটি থানা আর তার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি হারুন। গভীর রাতে একটি সড়ক দুর্ঘটনা দিয়ে গল্পের সূত্রপাত। প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছেলে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে গ্রেপ্তার হয়, আর তারপর থানার ভেতরে শুরু হয় চাপ, দর কষাকষি আর ক্ষমতার খেলা। হারুনকে একদিকে আইনের কথা ভাবতে হয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের জট সামলাতে হয়। প্রথম সিজনের গল্প মূলত এক রাতের ঘটনা আর তার পরের আট ঘণ্টার টানটান উত্তেজনা ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, এমনটাই জানিয়েছে যুগান্তর। এই সীমিত সময়ের কাঠামোই সিরিজটিকে আলাদা করেছে, কারণ দর্শক প্রায় বাস্তব সময়ের মতো করে থানার ভেতরের সিদ্ধান্তগুলো দেখতে পান।
প্রথম সিজনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বাস্তবতা। থানার পরিবেশ, পুলিশের কাজের ধরন, রাজনৈতিক চাপের ভাষা আর দুর্নীতির সূক্ষ্ম উপস্থিতি এমনভাবে দেখানো হয়েছে যে তা কল্পকাহিনি মনে হয় না। হারুন চরিত্রটি এখানে সরল নায়ক নয়। তিনি কৌশলী, কখনো আপস করেন, কখনো চাপের মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর এই দ্বিধাই তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। মোশাররফ করিমের মুখে শোনা একটি সংলাপ, দুটি কথা মনে রাখবেন, দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও যুগান্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। একটি সংলাপের জনপ্রিয়তা থেকেই বোঝা যায়, সিরিজটি কতটা দর্শকের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছিল।
গল্পের দ্বিতীয় স্তরে আছে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্ন। দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত তরুণটি সাধারণ কেউ নয়, তার বাবা প্রভাবশালী। ফলে থানায় ফোন আসে, লোক আসে, সমঝোতার প্রস্তাব আসে। হারুনের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়, আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি প্রভাবের কাছে আইন নত হয়। এই প্রশ্নের উত্তর সিরিজটি সরাসরি দেয় না, বরং ঘটনার মধ্য দিয়ে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। সেই কারণেই মহানগর শুধু থ্রিলার হিসেবে নয়, সমাজের আয়না হিসেবেও আলোচিত হয়েছে। পুলিশ, রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের সম্পর্কের যে জটিল ছবি এখানে আঁকা হয়েছে, তা অনেক দর্শকের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।
প্রথম সিজনের শেষটা ছিল রহস্যময়। সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, আর সেই অসমাপ্তি থেকেই দ্বিতীয় সিজনের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় সিজন মুক্তি পায় ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় সিজনের শুরুতেই দেখা যায় ওসি হারুনকে একটি অজ্ঞাত গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের ঘরে। সেখানে তাঁকে জেরা করা হচ্ছে, আর সেই জেরার সূত্র ধরে উঠে আসে দুই বছর আগের একটি ঘটনা, শাঁখারীবাজারের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বোমা হামলা। বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ আর অতীতের ওই ঘটনা মিলিয়ে দ্বিতীয় সিজন সিক্যুয়েল আর প্রিক্যুয়েলের মিশ্রণ তৈরি করেছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় সিজন শুধু আগের গল্পের ধারাবাহিকতা নয়, আগের গল্পের পেছনের গল্পও বটে।
দ্বিতীয় সিজনের এই কাঠামো দর্শকের জন্য একটু মনোযোগ দাবি করে। প্রথম সিজন দেখা থাকলে দ্বিতীয় সিজনের অনেক ইঙ্গিত সহজে ধরা যায়, আর না দেখা থাকলে কিছু প্রসঙ্গ অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। তাই দেখার ক্রম খুব সহজ, প্রথমে প্রথম সিজন, তারপর দ্বিতীয় সিজন। দ্বিতীয় সিজন প্রথম সিজনের ঘটনার পরের সময়ে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে ফিরে তাকায়, ফলে দুই সময়ের ঘটনা পাশাপাশি চলতে থাকে। এই ধরনের গল্প বলার ধরন বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজে তখনো খুব পরিচিত ছিল না, আর সেই সাহসের কারণেই দ্বিতীয় সিজন আলাদা আলোচনা পেয়েছিল।
কাস্টের দিকে তাকালে প্রথমেই আসে মোশাররফ করিমের নাম, ওসি হারুনের চরিত্রে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঞ্চ নাটক দিয়ে অভিনয় শুরু করা মোশাররফ করিম টিভি নাটক আর সিনেমাতেও বাজিমাত করেছেন, আর ওটিটিতেও তাঁর চমক দেখেছেন দুই বাংলার দর্শক। মহানগরে তাঁর অভিনয় সেই ধারাবাহিকতারই একটি বড় উদাহরণ। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাকিয়া বারী মম, শ্যামল মাওলাসহ আরও অনেকে। শ্যামল মাওলা অভিনয় করেছেন দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে আফনান চৌধুরীর চরিত্রে, যাঁকে ঘিরেই প্রথম সিজনের মূল সংকট তৈরি হয়।
নির্মাতা আশফাক নিপুণের নাম মহানগরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। সিরিজটি তিনি নির্মাণ করেছেন, আর নেটফ্লিক্সে মহানগরের আসার বিষয়টি তিনিই নিশ্চিত করেছেন বলে যুগান্তর জানিয়েছে। তাঁর নির্মাণের ধরনে বড় কোনো চমক দেখানোর চেষ্টা কম, বরং সংলাপ, চরিত্রের দ্বিধা আর পরিস্থিতির চাপ দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা হয়। থানার মতো সীমিত জায়গায়, সীমিত সময়ের মধ্যে গল্প বলার এই কৌশল মহানগরকে বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজের একটি মানদণ্ডে পরিণত করেছে। যাঁরা থ্রিলার পছন্দ করেন কিন্তু অতিরিক্ত অ্যাকশন নয়, বরং বুদ্ধির লড়াই দেখতে চান, তাঁদের জন্য এই সিরিজটি বিশেষভাবে উপযুক্ত।
মহানগর দেখার মূল ঠিকানা হইচই। ২০২১ সালে হইচইয়েই সিরিজটি মুক্তি পেয়েছিল, আর দুটি সিজনই সেখানেই দেখা যায়। হইচই বাংলাদেশের দর্শকের কাছে পরিচিত প্ল্যাটফর্ম, আর মহানগর তার অন্যতম পরিচিত অরিজিনাল কাজ। সিরিজটি দেখতে হইচইয়ের সাবস্ক্রিপশন লাগে, প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব অ্যাপ আর ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়। যাঁরা আগে হইচই ব্যবহার করেননি, তাঁদের জন্য পরামর্শ হলো, প্রথমে প্রথম সিজন শুরু করা, কারণ দ্বিতীয় সিজনের অনেক প্রসঙ্গ প্রথম সিজনের ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এবার আসা যাক নেটফ্লিক্স প্রসঙ্গে, যা নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। হইচই আর নেটফ্লিক্সের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে, যার লক্ষ্য হইচইয়ের জনপ্রিয় ও প্রশংসিত ওয়েব সিরিজ, নতুন প্রিমিয়ার আর নির্বাচিত রিমেক ভারতীয় দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই চুক্তির আওতায় হইচইয়ের নির্বাচিত সিরিজ হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং হবে। জাগো নিউজের ২৫ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহানগর ও বোহেমিয়ান ঘোড়া, মোশাররফ করিমের এই দুটি সিরিজ নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে। বোহেমিয়ান ঘোড়ার হিন্দি সংস্করণের নাম রাখা হয়েছে শাদি কা সিয়াপা, আর মহানগরের নাম একই থাকছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। চুক্তির ঘোষণা আর ১৪টি সিরিজের তালিকার কথা জানানো হলেও, মহানগরের নেটফ্লিক্সে আসার নির্দিষ্ট তারিখ আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয়েছে বলে এই গাইড লেখার সময় যাচাই করা প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। তাই নেটফ্লিক্সে মহানগর খুঁজতে গিয়ে না পেলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে খবরটি ভুল, বরং চুক্তির আওতায় সিরিজটি পর্যায়ক্রমে আসছে বলে ধরে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। নিশ্চিতভাবে বাংলায় মহানগর দেখতে চাইলে হইচই-ই এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। নেটফ্লিক্স সংস্করণ মূলত হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষার দর্শকের জন্য ডাব করা সংস্করণ হিসেবে আসছে, বাংলা মূল সংস্করণের বিকল্প হিসেবে নয়।
মহানগরের পর কী দেখবেন, এই প্রশ্নের উত্তরও এই চুক্তির মধ্যেই আছে। মোশাররফ করিমের আরেকটি আলোচিত সিরিজ বোহেমিয়ান ঘোড়া, যেখানে তিনি ট্রাকচালক আব্বাসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেটিও একই চুক্তির আওতায় নেটফ্লিক্সে আসছে। অমিতাভ রেজা চৌধুরী নির্মিত এই সিরিজটি মহানগরের চেয়ে ভিন্ন স্বাদের, কিন্তু মোশাররফ করিমের অভিনয়ের বৈচিত্র্য দেখতে চাইলে এটি ভালো পরের ধাপ। এছাড়া হইচইয়ের আরও ১২টি নির্বাচিত সিরিজ এই তালিকায় আছে বলে জানানো হয়েছে, যার মধ্যে মহানগরের মতো ক্রাইম থ্রিলার থেকে শুরু করে অন্যান্য ঘরানার কাজও আছে। তবে এই গাইডে শুধু যাচাই করা নামগুলোই উল্লেখ করা হলো, পুরো তালিকার প্রতিটি নাম আলাদাভাবে যাচাই না করে এখানে যোগ করা হয়নি।
তৃতীয় সিজন নিয়ে দর্শকের আগ্রহ স্বাভাবিক, কিন্তু এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এই গাইড লেখার সময় যাচাই করা প্রতিবেদনগুলোতে মহানগরের তৃতীয় সিজনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় সিজনের শেষের পর নতুন সিজনের গুঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু ঘোষণা ছাড়া তাকে তথ্য হিসেবে ধরা যাবে না। তাই তৃতীয় সিজন আসছে বলে কোথাও দাবি দেখলে তার উৎস যাচাই করে নেওয়া উচিত। হইচই বা নির্মাতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে তখনই তা নিশ্চিত খবর হিসেবে ধরা যাবে।
মহানগর কেন এখনো প্রাসঙ্গিক, তার উত্তর গল্পের ভেতরেই আছে। থানার ভেতরের ক্ষমতার লড়াই, প্রভাবশালী পরিবারের চাপ আর একজন কর্মকর্তার নৈতিক দ্বিধা, এই বিষয়গুলো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বাংলাদেশের দর্শক এই গল্পে নিজেদের চেনা বাস্তবতা দেখতে পান, আর পশ্চিমবঙ্গের দর্শক দেখতে পান প্রতিবেশী দেশের পুলিশি ব্যবস্থার একটি বিশ্বাসযোগ্য ছবি। সেই কারণেই ২০২১ সালের সিরিজ ২০২৬ সালেও নতুন দর্শক পাচ্ছে, আর নেটফ্লিক্স চুক্তির মাধ্যমে আরও বড় দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে মহানগর দেখার আগে যা মনে রাখা দরকার, তা হলো দেখার ক্রম আর প্রত্যাশা। এটি দ্রুতগতির অ্যাকশন সিরিজ নয়, ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকা একটি থ্রিলার। প্রথম সিজনের এক রাতের গল্প দিয়ে শুরু করুন, তারপর দ্বিতীয় সিজনে হারুনের অতীত আর বর্তমানের জট খুলতে দেখুন। বাংলায় দেখতে চাইলে হইচইয়ে দেখুন, আর হিন্দি, তামিল বা তেলুগু ভাষায় দেখতে চাইলে নেটফ্লিক্সের ঘোষণার দিকে নজর রাখুন। মহানগর বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে থেকে যাবে, কারণ এটি প্রমাণ করেছে যে একটি থানা, একটি রাত আর কয়েকটি চরিত্র দিয়েও বড় গল্প বলা যায়।
প্রশ্নোত্তরে সংক্ষেপে, মহানগর কী ধরনের সিরিজ, এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার, নির্মাতা আশফাক নিপুণ, মূল চরিত্র ওসি হারুন, অভিনয়ে মোশাররফ করিম। কয়টি সিজন আছে, দুটি সিজন মুক্তি পেয়েছে, প্রথমটি ২০২১ সালে হইচইয়ে, দ্বিতীয়টি ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল। কোথায় দেখবেন, বাংলায় হইচইয়ে, আর হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ডাব সংস্করণ হইচই-নেটফ্লিক্স চুক্তির আওতায় নেটফ্লিক্সে আসছে, তবে মহানগরের নির্দিষ্ট নেটফ্লিক্স তারিখ আলাদাভাবে ঘোষণা হয়নি। তৃতীয় সিজন কি আসছে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এই তথ্যগুলো মাথায় রেখে মহানগর দেখলে গল্পের প্রতিটি স্তর আরও পরিষ্কারভাবে ধরা দেবে।
