তিন দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমা ‘মাস্টার’। পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এই খবর জানিয়েছেন। ৩০ অক্টোবর ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে এই সূচি প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রদর্শনী আজই, ৩০ অক্টোবর, যুক্তরাজ্যের লিডসে।
সূচি অনুযায়ী, লিডস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৩০ ও ৩১ অক্টোবর দেখানো হবে ছবিটি। উৎসবের মূল আকর্ষণীয় বিভাগ কনস্টেলেশনে জায়গা পেয়েছে ‘মাস্টার’। এরপর ১ নভেম্বর বেলফাস্ট চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী হবে। সবশেষে ৯ থেকে ১১ নভেম্বর নরওয়ের অসলোতে ‘ফিল্মস ফ্রম দ্য সাউথ’ উৎসবে দেখা যাবে ছবিটি।
লিডস উৎসবের পক্ষ থেকে ছবিটিকে বাংলাদেশের চতুর ও টানটান উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক নাট্যধর্মী সিনেমা বলা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষমতার সূক্ষ্ম প্রভাব কীভাবে মানুষ ও সমাজকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে, তা ছবিটিতে অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বেলফাস্ট উৎসবের পক্ষ থেকে নির্মাণশৈলীর প্রশংসা করা হয়েছে, বিশেষ করে রং, বাস্তব প্রশাসনিক স্থাপনা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাণবন্ত ও জটিল এক জগৎ গড়ে তোলার জন্য।
পোস্টে সুমিত জানিয়েছেন, ‘মাস্টার’ সমকালীন বিশ্বকে প্রভাবিত করা ক্ষমতার নীরব ও পরিবর্তনশীল কাঠামো নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। লিডস, বেলফাস্ট ও অসলোতে বসবাসরত দর্শকদের পাশাপাশি সেখানে থাকা বন্ধু ও স্বজনদেরও তিনি প্রদর্শনীতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অর্থাৎ প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকদের কাছেও এই প্রদর্শনীগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
ছবির কেন্দ্রে আছেন জাহির, একজন সম্মানিত শিক্ষক। আদর্শ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে ঢুকলেও ক্ষমতার চাপে ধীরে ধীরে তিনি নিজের নীতির সঙ্গে আপস করতে থাকেন। গ্রামীণ বাংলাদেশের স্থানীয় শাসন, ক্ষমতার সম্পর্ক আর একজন মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্বই ছবির মূল উপজীব্য। চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক নিজে আর সাব্বির হোসেন শোভন। জাহির চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। তাঁর সঙ্গে আছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, শরিফ সিরাজ আর তাসনোভা তামান্না।
এই তিনটি উৎসবের আগে ‘মাস্টার’ আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে লন্ডন ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটির যুক্তরাজ্য প্রিমিয়ার হয়। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও জায়গা পায় ছবিটি। অর্থাৎ লিডস, বেলফাস্ট আর অসলোর সূচি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক যাত্রারই পরের ধাপ।
সুমিতের আগের ছবি ‘নোনাজলের কাব্য’ বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সাতটি বিভাগে জিতেছিল। ‘মাস্টার’ তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। এর আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে, যেখানে ছবিটি বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল। পরে ইতালির লুকা চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার পায় এটি। আর ৫৩তম বেলগ্রেড আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতেছেন সুমিত ও শোভন।
লিডসে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গও সুমিত তুলেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নোনাজলের কাব্য’র পর দ্বিতীয়বারের মতো এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন তিনি। একের পর এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের সমসাময়িক সিনেমার জন্য বড় খবর, কারণ এতে দেশের গল্প বিশ্ব দর্শকের কাছে পৌঁছায়। এই প্রতিবেদনে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির বিষয়ে নতুন কিছু জানানো হয়নি, তাই আপাতত উৎসবের পর্দাই ছবিটির ঠিকানা। লিডস, বেলফাস্ট ও অসলোর প্রদর্শনীর পর দর্শক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেটাই পরের নজরদারির বিষয়।
ছবিটির নির্মাণেও ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। দক্ষিণ কোরিয়ায় পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ হয়েছে, সম্পাদনায় ছিলেন একাডেমি সদস্য ক্রিস্টান স্প্রেগ, আর সংগীত পরিচালনা করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক তাইওয়ানিজ সুরকার হাও টিং শি। সরকারি অনুদানে নির্মিত ছবিটির শুটিং শেষ হয়েছিল গত বছর এপ্রিলে, আর গল্পের পটভূমি একটি উপজেলার স্থানীয় রাজনীতি। এই পটভূমি আর আন্তর্জাতিক কারিগরি দল মিলেই ছবিটিকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে উৎসবের দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
