স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক মনসামঙ্গল নিয়ে দর্শকের কৌতূহল বাড়ছে দিন দিন। কারণ এই ধারাবাহিকে দেবী মনসার ভূমিকায় ফিরছেন দিতিপ্রিয়া রায়, যাঁকে দর্শক রানি রাসমণি হিসেবে মনে রেখেছে। প্রথম ঝলক প্রকাশের পর থেকে প্রশ্ন একটাই, ধারাবাহিকটি কবে থেকে দেখা যাবে, গল্পটা কী, আর কোথায় দেখা যাবে। এই গাইডে প্রথম ঝলক, দিতিপ্রিয়ার প্রত্যাবর্তনের গল্প, মনসার লোককথার প্রেক্ষাপট, সম্প্রচারের তারিখ নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে আর যা যায়নি, সবকিছু এক জায়গায় সাজানো হলো।
শুরুতেই সবচেয়ে জরুরি তথ্যটা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো। মনসামঙ্গলের সম্প্রচারের তারিখ আর সময়সূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি। ১১ অক্টোবর এবিপি লাইভ বাংলাকে দিতিপ্রিয়া নিজেই জানিয়েছিলেন, পুজোর পরেই শুটিং শুরু হবে, তবে সম্প্রচারের দিন নিয়ে সিদ্ধান্ত তখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২৭ অক্টোবর আনন্দবাজারকে তিনি জানান, তখন পর্যন্ত শুধু লুক সেটের কাজ হয়েছে, শুটিং শুরু হয়নি। তাই এই গাইডে কোনো তারিখ বা স্লটকে চূড়ান্ত বলে দাবি করা হয়নি। যা শোনা যাচ্ছে, তা শোনা যাচ্ছে হিসেবেই লেখা হয়েছে।
প্রথম ঝলকেই নজর কেড়েছেন দিতিপ্রিয়া। এবিপি লাইভ বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসে ধারাবাহিকের প্রথম ঝলক। সেখানে মনসা রূপে দিতিপ্রিয়াকে দেখা গেছে গোলাপি বেনারসি, খোলা চুল আর পদ্ম সাজে। এই লুক নিয়েই দর্শকের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আনন্দবাজারকে দিতিপ্রিয়া জানিয়েছেন, লুক সেটে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত এই লুকটাই চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ঝলকের লুকটি হঠাৎ করে বেছে নেওয়া হয়নি, এর পেছনে ভাবনা আর পরীক্ষা দুটোই ছিল।
মনসামঙ্গলের গল্প কী হবে, সেটা বুঝতে হলে মনসার লোককথাটা মনে রাখা দরকার। লোককথা অনুযায়ী, মনসা সাপের দেবী, আর তাঁর গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিবের সঙ্গে পিতা কন্যার সম্পর্ক, চাঁদ সদাগরের কাহিনি, আর মানুষের ভক্তি আদায়ের সংগ্রাম। আজতক বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধারাবাহিকে কীভাবে দেবীর জন্ম হলো, শিবের সঙ্গে তাঁর পিতা কন্যার সম্পর্ক, আর তাঁর প্রভাব, এসব নিয়েই গল্প এগোবে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁদ সদাগরের কাহিনিও দেখা যাবে বলে খবর রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, ধারাবাহিকটি লোককথার ঠিক কোন অংশকে কীভাবে সাজাবে, তা নির্মাতারা এখনো বিস্তারিতভাবে জানাননি।
এই ধারাবাহিকের সবচেয়ে আলাদা দিকটি দিতিপ্রিয়া নিজেই তুলে ধরেছেন। আনন্দবাজারকে তিনি বলেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মা মনসার নেতিবাচক দিকটাই দেখা গেছে, কিন্তু এই ধারাবাহিকে তাঁর ভালো দিকটা ফুটিয়ে তোলা হবে। এই মন্তব্যটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ধারাবাহিকের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝায়। মনসাকে শুধু ভয় বা প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং তাঁর জীবনের অজানা গল্প আর মানবিক দিক থেকে দেখানোর চেষ্টা থাকবে বলে মনে হচ্ছে। দিতিপ্রিয়া আরও বলেছেন, মনসামঙ্গলের গল্প সবার জানা, কিন্তু একটি গল্পের পেছনে আরও বড় একটি গল্প থাকে, আর সেই অজানা গল্পটাই তিনি এই চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চান।
দিতিপ্রিয়ার জন্য এই ধারাবাহিক শুধু একটি নতুন কাজ নয়, এটি ছোট পর্দায় প্রত্যাবর্তন। এবিপি লাইভ বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোটপর্দা থেকেই তাঁর উত্থান, পরে তিনি বড় পর্দাতেও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তবে দর্শক তাঁকে ধারাবাহিকে দেখার জন্য মুখিয়ে থাকেন। আনন্দবাজার লিখেছে, করুণাময়ী রানি রাসমণিতে নামভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিপুল সাড়া ফেলেছিলেন। সেই ধারাবাহিক শেষের পর অনেকখানি সময় ছোট পর্দা থেকে দূরে ছিলেন তিনি, আর বড় পর্দা ও সিরিজের কাজে জোর দিয়েছিলেন।
প্রায় তিন বছর পর তিনি ধারাবাহিকে ফেরেন। আনন্দবাজার অনুযায়ী, একটি রোম্যান্টিক ধারাবাহিকে জিতু কমলের সঙ্গে জুটি বেঁধেছিলেন তিনি। এরপর সহ অভিনেতার সঙ্গে নানা সমস্যা আর মতবিরোধ হওয়ায় সেই ধারাবাহিক মাঝপথেই ছেড়েছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতার পর মনসামঙ্গল দিয়ে ফেরা তাই শুধু কামব্যাক নয়, বরং সচেতনভাবে বেছে নেওয়া একটি চরিত্রে ফেরা। দিতিপ্রিয়া নিজেও বলেছেন, এই মুহূর্তে এই ধরনের কোনো ধারাবাহিক চলছে না, তাই চরিত্রটি অন্যরকম হবে বলে তাঁর মনে হয়েছে।
প্রত্যাবর্তনের আগে বিরতি নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেছেন দিতিপ্রিয়া। এবিপি লাইভ বাংলাকে তিনি বলেছেন, ক্যামেরা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, লাইটস, ক্যামেরা, অ্যাকশনের দুনিয়াটা তিনি ভীষণ উপভোগ করেন। কিন্তু তার মধ্যেও মাঝে মাঝে বিরতি দরকার। কয়েক মাস ইচ্ছে করেই কাজ করেননি, ওই সময়টা নিজের সঙ্গে কাটিয়েছেন, পড়াশোনা করেছেন, ঘুরতে গিয়েছেন, আর ওয়ার্কআউট করে বেশ কিছুটা ওজনও ঝরিয়েছেন। এই বিরতি তাই হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় ছিল।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো মুম্বইয়ের কাজের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া। এবিপি লাইভ বাংলাকে দিতিপ্রিয়া বলেছেন, মায়ানগরীতে কাজ করা যেকোনো অভিনেত্রীরই স্বপ্ন, কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, তিনি ভীষণ হোমসিক, পরিবারের সঙ্গে থাকতে আর পোষ্যের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। মুম্বইয়ের কাজ নিলে তাঁকে সেখানে চলে যেতে হতো, আর ততদিনে তিনি এখানে দুটি সিরিজের কাজ করবেন বলে কথা দিয়ে দিয়েছেন। মুম্বই গেলে চট করে সেখান থেকে কাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন বলেও মনে করেন তিনি। আর মনসামঙ্গলের কাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা চলছিল, তাই শেষ পর্যন্ত ঘরের কাছের এই চরিত্রটাই তিনি বেছে নেন।
মনসামঙ্গলের প্রস্তুতি কেন সময় নিল, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন দিতিপ্রিয়া। তাঁর কথায়, এই কাজে মাইথোলজি রয়েছে, পাশাপাশি লোকসজ্জা, লুক, এমন অনেক জিনিস মাথায় রাখতে হচ্ছিল। তাই দর্শকের সামনে ঝলকটা নিয়ে আসতে কিছুটা সময় লেগে গেছে। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, নির্মাতারা পৌরাণিক ধারাবাহিককে হালকাভাবে নেননি। পোশাক, সাজ, লোককথার আবহ, সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় মাপের প্রযোজনার চেষ্টা চলছে বলে আনন্দবাজারও উল্লেখ করেছে, প্রোমো দেখে বোঝা যাচ্ছে বড় মাপে এই ধারাবাহিক তৈরির কথা ভেবেছেন নির্মাতারা।
এবার আসা যাক স্লট নিয়ে শোনা কথায়। আজকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শোনা যাচ্ছে লক্ষ্মী ঝাঁপি শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর সেই স্লটেই আসতে পারে মনসামঙ্গল। এই তথ্যটিকে সতর্কভাবে পড়তে হবে। এটি একটি শোনা যাওয়া খবর, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। লক্ষ্মী ঝাঁপি শেষ হওয়ার পর স্টার জলসার সন্ধ্যার স্লটে বদল আসা স্বাভাবিক, কিন্তু মনসামঙ্গল ঠিক কোন স্লট পাবে, তা চ্যানেল জানালেই নিশ্চিত হবে। তাই এই গাইডে কোনো সময়কে মনসামঙ্গলের সময় বলে চালানো হয়নি।
কোথায় দেখা যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত এটুকুই নিশ্চিত। ধারাবাহিকটি স্টার জলসায় সম্প্রচারিত হবে। স্টার জলসার ধারাবাহিকগুলো টেলিকাস্টের পর জিওহটস্টারে স্ট্রিম হয়, এটাই চ্যানেলের নিয়মিত ব্যবস্থা। তাই সম্প্রচার শুরু হলে টিভিতে স্টার জলসায় আর অনলাইনে জিওহটস্টারে পর্ব দেখা যাবে বলে আশা করা যায়। তবে বাংলাদেশের দর্শকের জন্য স্ট্রিমিংয়ের প্রাপ্যতা অঞ্চলভেদে বদলাতে পারে, আর টিভিতে দেখার ক্ষেত্রে ক্যাবল বা ডিটিএইচে চ্যানেলটি থাকা দরকার। আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা হলে এই অংশ হালনাগাদ করা হবে।
দিতিপ্রিয়ার কাজের চাপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ ধারাবাহিকের পাশাপাশি তাঁর ওয়েব সিরিজের কাজও রয়েছে। এবিপি লাইভ বাংলাকে তিনি বলেছেন, ধারাবাহিক চলাকালীন সিরিজের শুটিংও রয়েছে, আর আশা করছেন সবটা ম্যানেজ হয়ে যাবে। এই জীবনটা তিনি ভীষণ উপভোগ করেন বলেও জানিয়েছেন। প্রথম ঝলক নিয়ে এখন পর্যন্ত খুব ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি, আর আশা করছেন ধারাবাহিকটাও মানুষ ভালোবাসবেন।
এই গাইডের সঙ্গে আমাদের আগের লেখার পার্থক্যটাও জানিয়ে রাখা ভালো। ১৫ অক্টোবর আমরা শুধু এই খবরটি প্রকাশ করেছিলাম যে দিতিপ্রিয়া জি বাংলা ছেড়ে স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক মনসামঙ্গলে আসছেন। সেই লেখাটি ছিল একটি ঘোষণা। এই লেখাটি সম্পূর্ণ গাইড। এখানে প্রথম ঝলকের লুক, দিতিপ্রিয়ার বিরতি আর মুম্বইয়ের প্রস্তাব ফেরানোর গল্প, মনসার লোককথার প্রেক্ষাপট, স্লট নিয়ে শোনা কথা, আর কোথায় দেখা যাবে, সবকিছু একসঙ্গে রয়েছে।
দর্শকের জন্য এখন করণীয় স্পষ্ট। প্রথম ঝলক দেখে চরিত্রের লুক সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়, কিন্তু সম্প্রচারের তারিখের জন্য চ্যানেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করতে হবে। স্লট নিয়ে শোনা কথা, ফ্যান পেজের দাবি, বা পুরোনো প্রোমোকে চূড়ান্ত তথ্য ভেবে ভুল করার দরকার নেই। নতুন প্রোমো, সময়সূচি, আর বাকি কাস্টের ঘোষণা এলে এই গাইডের তথ্য তখনই পূর্ণ হবে।
বাংলার ঘরে ঘরে মনসার গল্প নতুন নয়, আর সেটাই এই ধারাবাহিকের বাড়তি সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ দুটোই। মনসামঙ্গল কাব্য, শ্রাবণ মাসের মনসা পুজো, আর বেহুলা লখীন্দরের কাহিনি বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দর্শক তাই এই গল্পের মূল কাঠামো আগে থেকেই চেনেন, আর সেই চেনা গল্পকে নতুনভাবে বলাই নির্মাতাদের আসল পরীক্ষা। দিতিপ্রিয়ার মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্মাতারা সেই পরীক্ষার জায়গাটা বুঝেছেন। তাঁরা মনসাকে শুধু ভয়ের দেবী হিসেবে নয়, বরং একজন সংগ্রামী নারী চরিত্র হিসেবে দেখাতে চাইছেন, যাঁর ভালো দিকটা এত দিন আড়ালে ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করলে মনসামঙ্গল শুধু পৌরাণিক ধারাবাহিকের তালিকায় আরেকটি নাম হবে না, বরং লোককথাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি চেষ্টা হিসেবে মনে থাকবে।
প্রশ্নোত্তর। মনসামঙ্গল কী নিয়ে। দেবী মনসার লোককথা নিয়ে স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক, যেখানে নামভূমিকায় দিতিপ্রিয়া রায়। কবে থেকে দেখা যাবে। এখনো আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা হয়নি, পুজোর পর শুটিং শুরুর কথা জানিয়েছিলেন দিতিপ্রিয়া, আর ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু লুক সেট হয়েছিল। কোথায় দেখা যাবে। টিভিতে স্টার জলসায়, আর টেলিকাস্টের পর চ্যানেলের নিয়মিত ব্যবস্থা অনুযায়ী জিওহটস্টারে। কোন স্লটে আসবে। এখনো ঘোষণা হয়নি, লক্ষ্মী ঝাঁপির স্লটে আসার কথা শোনা যাচ্ছে মাত্র। দিতিপ্রিয়া কেন মুম্বইয়ের প্রস্তাব ফেরালেন। পরিবারের সঙ্গে থাকতে চাওয়া, এখানে দুটি সিরিজের প্রতিশ্রুতি, আর মনসামঙ্গল নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা, এই কারণগুলোর কথা তিনি নিজেই বলেছেন। মনসামঙ্গল কেন আলাদা। দিতিপ্রিয়ার ভাষায়, এখানে মনসার নেতিবাচক দিক নয়, তাঁর ভালো দিক ফুটিয়ে তোলা হবে।
