মা হওয়ার পর শরীর নিয়ে কটাক্ষের জবাব দিলেন ক্যাটরিনা কাইফ। ভোগ ইন্ডিয়ার প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, মাতৃত্বের পর আসলে কোথা থেকে ফিরে আসতে হবে। তাঁর বক্তব্য ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীর নিয়ে সমাজের প্রত্যাশা কতটা চাপ তৈরি করে, সেই প্রশ্নটাই তিনি সামনে এনেছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারেই ক্যাটরিনা নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
ঘটনার শুরু গত সেপ্টেম্বরে। ১৪ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ে আম্বানি পরিবারের গণেশ চতুর্থী উদযাপনে স্বামী ভিকি কৌশলের সঙ্গে হাজির হয়েছিলেন ক্যাটরিনা। সন্তান জন্মের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে এটিই ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য জনসমক্ষে উপস্থিতিগুলোর একটি। কিন্তু উৎসবের সাজ বা উপস্থিতি নিয়ে আলোচনার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশের মনোযোগ আটকে যায় তাঁর শরীরের পরিবর্তনে। আগের ছবি আর সাম্প্রতিক ছবির তুলনা করে নানা কোলাজ ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। কেউ ওজন নিয়ে মন্তব্য করেন, কেউ চেহারার পরিবর্তনকে তাঁর ক্যারিয়ারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে দেন। এমনকি তাঁকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যও করা হয়। অথচ তখন সন্তান জন্ম দিয়েছেন এক বছরেরও কম সময় আগে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ছেলে ভিহানকে জন্ম দিয়েছেন ক্যাটরিনা। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সন্তান তাঁর জীবনের গভীর একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের পর এখন জীবনের এই পর্যায়ের আনন্দ এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে চান তিনি। চেহারা নিয়ে আলোচনা যেন তাঁর জীবনের বড় অংশ দখল করে না নেয়, সেটিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মাতৃত্বকে তিনি পেছনে ফেরার মতো কিছু হিসেবে দেখছেন না, বরং জীবনের সামনের ধাপ হিসেবে দেখছেন।
নিজের শরীর নিয়ে ক্যাটরিনার ভাষা ছিল শান্ত, কিন্তু স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, সন্তান জন্মের পর নিজের শরীর নিয়ে মানুষের মন্তব্য তাঁকে ঘিরে আলোচনার বড় অংশ হয়ে উঠুক, তা তিনি চান না। বরং মাতৃত্বের এই সময়টুকু উপভোগ করতে চান। নিজের শরীরের সুস্থতা ও কর্মক্ষমতার দিকে নজর রাখছেন তিনি, তবে অন্যের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নয়, নিজের গতিতে। তাঁর ভাষায়, আমি আমার ফিটনেসের যাত্রা সম্পর্কে খুব সচেতন। আমার শরীর কখন সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম ও উদ্যমী বোধ করে, সেটাও জানি। আমি নিজের গতিতেই সেখানে পৌঁছাব।
এই বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। যোগাযোগমাধ্যমে অনেক নারী প্রশ্ন তুলেছেন, সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীর নিয়ে এমন মন্তব্য করার অধিকার অন্যদের কে দিয়েছে। ক্যাটরিনার চেহারা নিয়ে কটাক্ষের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকে নারীর শরীরকে বিচার করার এই প্রবণতার বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। এখানেই এই খবরটি শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি হয়ে উঠছে মাতৃত্ব, শরীর এবং জনপরিসরে নারীর ওপর চাপ নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ।
সাক্ষাৎকারে স্বামী ভিকি কৌশলকে নিয়েও কথা বলেছেন ক্যাটরিনা। তাঁর কাছে ভিকি শুধু একজন ভালো স্বামী নন, ছেলেরও অসাধারণ বাবা। কাজের ব্যস্ততা থাকলেও স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে ভিকির উপস্থিতিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। ক্যাটরিনার ভাষায়, ভিকির একটি সুপারপাওয়ার আছে। তিনি যখন তাঁর ও ছেলে ভিহানের সঙ্গে থাকেন, তখন পুরোপুরি তাঁদের সঙ্গেই থাকেন। অর্থাৎ কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়টুকুতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন ভিকি।
সন্তান জন্মের পর দম্পতির ব্যক্তিগত সময় কাটানোর ধরনও বদলে গেছে। আগে যে রোমান্টিক ডিনার কিংবা একসঙ্গে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা করা যেত, এখন সেসবের অনেক কিছুই হচ্ছে গাড়ির পেছনের আসনে বসে। ছোট ছোট এই মুহূর্তই এখন তাঁদের কাছে একসঙ্গে সময় কাটানোর উপায়। ভিকি ক্যাটরিনাকে মনে করিয়ে দেন, সবকিছুরই নিজস্ব সময় আছে। কথাটি ক্যাটরিনার বর্তমান জীবনযাত্রার সঙ্গেও মিলে যায়। মাতৃত্ব, ব্যক্তিগত সময় কিংবা কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত, কোনোটির জন্যই নির্দিষ্ট সময়সীমার চাপ নিতে চান না তিনি।
অভিনয়জীবন নিয়েও কথা বলেছেন ক্যাটরিনা। তবে আপাতত সিনেমায় ফেরার কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই তাঁর। নতুন কোনো চরিত্রে অভিনয়ের আগে এমন কিছু করতে চান, যা তাঁকে অভিনয়ের ভিন্ন একটি স্তরে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয়ের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রোমান্টিক, অ্যাকশন ও কমেডি, বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এবার পর্দায় নেতিবাচক চরিত্রের জটিলতা অনুসন্ধানের ইচ্ছা তাঁর।
কেন এই জবাব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝা কঠিন নয়। তারকাদের শরীর নিয়ে মন্তব্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু সন্তান জন্মের পর সেই মন্তব্য আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ক্যাটরিনা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের সীমা টেনে দিয়েছেন। তিনি কাউকে আক্রমণ করেননি, বরং নিজের গতির কথা বলেছেন। এই অবস্থান অনেক দর্শকের কাছেই পরিচিত মনে হতে পারে, কারণ মাতৃত্বের পর শরীর, কাজ আর ব্যক্তিগত সময়ের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন শুধু তারকাদের নয়, সাধারণ জীবনেও ওঠে।
এরপর কী, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলা। ক্যাটরিনা কবে কোন চরিত্রে ফিরবেন, তা তিনি নিজেই জানাননি। আপাতত তাঁর বার্তা একটাই, মাতৃত্ব উপভোগ করা এবং নিজের গতিতে এগোনো। ভোগের প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকারটি সেই বার্তাকেই সামনে এনেছে। দর্শকেরা এখন দেখবেন, এই আলোচনা শুধু সাক্ষাৎকারেই থামে, নাকি তারকাদের শরীর নিয়ে মন্তব্যের ধরন বদলাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে।
