গতকাল ২২ অক্টোবর ছিল কাদের খানের জন্মদিন। ১৯৩৭ সালের এই দিনে আফগানিস্তানের কাবুলে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ৮১ বছর বয়সে মারা যান। হিন্দি সিনেমায় কাদের খানের নাম মনে করলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে গোবিন্দর সঙ্গে তাঁর হাস্যরসাত্মক দৃশ্য, গম্ভীর মুখে বলা মজার সংলাপ, কিংবা অমিতাভ বচ্চনের ছবিতে তাঁর লেখা নাটকীয় সংলাপ। কখনো তিনি ধনী ব্যবসায়ী, কখনো কঠোর বাবা, কখনো দুর্নীতিবাজ ভিলেন, আবার কখনো এমন এক মানুষ, যাঁর উপস্থিতিতেই হাসিতে ফেটে পড়ত প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু পর্দার এই পরিচিত মানুষটির জীবন ছিল অনেক বেশি কঠিন, অনেক বেশি নাটকীয়।
শৈশব কেটেছে মুম্বাইয়ের কামাথিপুরার বস্তিতে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কাদের খান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারে সপ্তাহে তিন দিন পেটে খাবার জুটত না। বাবা আবদুর রহমান খান ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি, মা ইকবাল বেগমের আদি নিবাস ছিল বর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তান অঞ্চলে। শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে আসেন কাদের। মা-বাবার বিচ্ছেদ, সংসারে অভাব আর পারিবারিক অশান্তির মধ্য দিয়েই বড় হতে হয়েছে তাঁকে। দারিদ্র্যের কারণে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করে সংসারে সাহায্য করবেন।
কিন্তু কাদের খানের মা অন্য কথা ভেবেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ছেলেকে দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের করে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ শিক্ষা। তাই চরম অভাবের মধ্যেও কাদেরের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তিনি। মায়ের সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তী জীবনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কামাথিপুরার জীবন কাদেরকে শুধু দারিদ্র্য দেখায়নি, দেখিয়েছিল মানুষের নানা রূপ। একই জায়গায় যেমন ছিল অসহায়ত্ব, তেমনি ছিল বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা। পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা চরিত্র ও সংলাপে সাধারণ মানুষের জীবনবোধ, ক্ষোভ আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের যে ছাপ দেখা যায়, তার পেছনে শৈশবের এসব অভিজ্ঞতার ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে লেখালেখি করা অনেকে।
পড়াশোনা চালিয়ে কাদের খান মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইসমাইল ইউসুফ কলেজে পড়েন, তারপর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে মুম্বাইয়ের এম এইচ সাবু সিদ্দিক কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি, সেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন। কিন্তু ভেতরে তখন অন্য এক আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধছে। ছোটবেলা থেকেই নাটক ও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। সুযোগ পেলেই মঞ্চে অভিনয় করতেন, নাটক লিখতেন। একটি বহুল আলোচিত ঘটনা: বাড়ির কাছের একটি ইহুদি কবরস্থানে গিয়ে তিনি একা একা সংলাপ বলতেন, অভিনয়ের অনুশীলন করতেন। একদিন সেখানে তাঁর অভিনয় লক্ষ করেন অভিনেতা আশরাফ খান, আর কাদেরের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
চলচ্চিত্রে কাদের খানের যাত্রা শুরু লেখক হিসেবে। ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া 'জওয়ানি দিওয়ানি' ছবিতে সংলাপ লেখার সুযোগ পান তিনি। রণধীর কাপুর ও জয়া ভাদুড়ি অভিনীত এই ছবিতে মঞ্চে তাঁর কাজ দেখে প্রযোজক রমেশ বহল তাঁকে সুযোগ দিয়েছিলেন। কাদের নিজেই জানিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রের সংলাপ লেখার অভিজ্ঞতা তখন তাঁর ছিল না, তবু নাটকে যেভাবে লেখেন সেভাবেই লিখতে বলা হয়েছিল। প্রথম ছবির জন্য পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন মাত্র দেড় হাজার রুপি। এরপর 'খেল খেল মে' ছবিতে কাজের সুযোগ আসে, পারিশ্রমিকও বাড়ে।
বড় স্বীকৃতি আসে প্রযোজক-পরিচালক মনমোহন দেশাইয়ের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে। 'রোটি' ছবিতে কাজের পর তাঁর পারিশ্রমিক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এই ছবির জন্য পেয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার রুপি, প্রথম ছবির দেড় হাজার রুপির তুলনায় যা ছিল বিশাল অগ্রগতি।
সত্তরের দশক থেকে আশির দশক, হিন্দি সিনেমায় অমিতাভ বচ্চনের উত্থানের সময়। পর্দায় তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ আর সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকদের মুগ্ধ করত, আর সেই সংলাপের জগৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল কাদের খানের। 'অমর আকবর অ্যান্টনি', 'মুকাদ্দর কা সিকান্দার', 'নসিব', 'লাওয়ারিস', 'শরাবি', 'কুলি' ও 'অগ্নিপথ' এর মতো ছবিতে তাঁর লেখনী হিন্দি সিনেমার সংলাপনির্ভর বিনোদনের এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিল। পরিচালক মনমোহন দেশাই ও প্রকাশ মেহরার সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি অভিনেতা হিসেবেও যাত্রা শুরু করেন কাদের খান। ১৯৭৩ সালে যশ চোপড়ার 'দাগ' ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়, ছবিতে রাজেশ খান্না ছিলেন প্রধান চরিত্রে। শুরুতে অনেক সময় নেতিবাচক চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে, 'পরভারিশ', 'নসিব'সহ বেশ কিছু ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রে ছিল ক্ষমতা আর দম্ভের ছাপ। তবে কেবল ভিলেনের ভূমিকায় তাঁকে আটকে রাখা যায়নি। কখনো পরিবারের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবীণ, কখনো অর্থবান ব্যবসায়ী, কখনো বিপাকে পড়া বাবা, চরিত্র বদলালেও অভিনয়ে থাকত স্বতন্ত্র ছাপ।
নব্বইয়ের দশকে কাদের খানের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় অধ্যায় শুরু হয় গোবিন্দ ও পরিচালক ডেভিড ধাওয়ানের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে। 'কুলি নাম্বার ওয়ান', 'রাজা বাবু', 'হিরো নাম্বার ওয়ান', 'দুলহে রাজা', 'আঁখে' ও 'সাজন চলে সসুরাল' এর মতো ছবিতে তাঁর গম্ভীর মুখের অভিব্যক্তি আর দ্রুত সংলাপ বলার দক্ষতা গোবিন্দর কমেডির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
স্বীকৃতিও কম আসেনি। 'মেরি আওয়াজ সুনো' ছবির জন্য ১৯৮২ সালে এবং 'আঙ্গার' ছবির জন্য ১৯৯৩ সালে ফিল্মফেয়ারে সেরা সংলাপকারের পুরস্কার পান তিনি। 'বাপ নম্বরি বেটা দশ নম্বরি' ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৯১ সালে ফিল্মফেয়ারে সেরা কমেডি অভিনেতার পুরস্কারও অর্জন করেন। ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
জীবনের শেষ পর্যায় ছিল অনেকটাই নিভৃত। বয়স বাড়ার সঙ্গে কাজের সুযোগ কমে আসে, শারীরিক অসুস্থতাও তাঁকে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শেষ কয়েক বছরে তিনি কানাডায় ছেলের কাছে থাকতেন। প্রগ্রেসিভ সুপ্রানিউক্লিয়ার পালসি নামের স্নায়বিক রোগে ভুগছিলেন তিনি, সঙ্গে ছিল ডায়াবেটিস। ২০১৮ সালের শেষ দিকে শ্বাসকষ্টের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৩১ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
কাদের খানকে মনে রাখা হবে দুই কারণে। এক, সংলাপকার হিসেবে তিনি হিন্দি সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছিলেন, নাটকীয়তা, রসবোধ আর উর্দু ভাষার সৌন্দর্য মিশিয়ে। দুই, অভিনেতা হিসেবে ভিলেন থেকে কমেডিয়ান, সব চরিত্রেই তিনি ছিলেন অনন্য। কামাথিপুরার যে শিশুর সপ্তাহে তিন দিন খাবার জুটত না, সেই শিশুই একদিন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নিজের নাম লিখে গেলেন, এ গল্প শুধু সিনেমার নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও।
