ইরানের অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন একটি মামলায় পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। একই রায়ে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছরের জন্য বিদেশযাত্রা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নির্মাতার আইনজীবী মোস্তফা নিলি এই তথ্য জানিয়েছেন। খবরটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, কারণ পানাহির সর্বশেষ ছবি এখন অস্কারের দৌড়ে রয়েছে।
তেহরানের বিপ্লবী আদালতের ২৬ নম্বর শাখা পানাহির অনুপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করে। আইনজীবীর দাবি, মামলার শুনানির বিষয়ে পানাহিকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে তার ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা রায়ের বিষয়ে জানতে পারেন। ঠিক কী অভিযোগে তাকে নতুন করে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এই অস্পষ্টতাই রায় ঘিরে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন এই দণ্ড তার বিরুদ্ধে আগের একটি মামলার রায় থেকে আলাদা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পানাহিকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের জুনে সেই দণ্ড বহাল রাখে আদালত। ফলে দুই মামলায় তার মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ছয় বছর এক মাসে। তবে নতুন রায়ের পর এখনো পানাহিকে কারাগারে নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পানাহির বিরুদ্ধে বর্তমানে আরও তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত মাসে এর মধ্যে একটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনি হাজিরও হয়েছিলেন। অর্থাৎ আইনি চাপ একটিমাত্র রায়ে সীমাবদ্ধ নয়, একাধিক মামলা একসঙ্গে তার সামনে ঝুলে আছে। এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আইনজীবীর বক্তব্যের বাইরে আদালতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচিত এই নির্মাতা চাইলে বিদেশে অবস্থান করতে পারতেন। কিন্তু গত ৩০ মার্চ তিনি ইরানে ফিরে যান। ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পানাহি বলেছিলেন, নিজের দেশে থাকা তার জন্য প্রয়োজনীয়। কর্তৃপক্ষ কারাদণ্ড কার্যকর করতে চাইলে তা করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। দেশে ফেরার এই সিদ্ধান্তই এখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
পানাহির পরিচালিত ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দর জেতে। পরে ছবিটি ২০২৬ সালের অস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ফ্রান্সের মনোনয়ন হিসেবে নির্বাচিত হয় এবং চূড়ান্ত মনোনয়নও পায়। অস্কারের মৌসুমের ঠিক এই সময়ে নির্মাতার বিরুদ্ধে এমন রায় আসায় ছবির প্রচার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আইনি বিরোধের মধ্যেও রয়েছেন পানাহি। ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের পর তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য লেখা, সাক্ষাৎকার দেওয়া ও বিদেশ ভ্রমণের ওপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর ২০২২ সালে আবারও গ্রেপ্তার হন এই নির্মাতা। প্রায় সাত মাস কারাগারে থাকার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান তিনি। নিষেধাজ্ঞা আর গ্রেপ্তারের এই দীর্ঘ ইতিহাসই পানাহিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত নির্মাতায় পরিণত করেছে।
এখন সবার নজর থাকবে রায় কার্যকর হয় কি না এবং কবে, তার দিকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এখনো তাকে কারাগারে নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি বিচারাধীন তিনটি মামলার গতিপথও পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। অস্কারের চূড়ান্ত পর্ব এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই খবর আন্তর্জাতিক মহলে আরও আলোচনায় আসবে বলেই মনে হচ্ছে। নতুন কোনো আইনি সিদ্ধান্ত বা নির্মাতার পক্ষ থেকে বক্তব্য এলে সেই আপডেটও জানানো হবে।
