ফ্রান্সের এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে চলছে বাংলাদেশের সিনেমা পথের বন্ধুর শুটিং। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের ২৫টি শহরে বাস্তব লোকেশনে ছবিটির শুটিং চলছে। কোনো কৃত্রিম সেট নয়, নদীর পাড়ের বেঞ্চ, রাস্তার পাশ, ছোট শহরের পথ আর চলন্ত গাড়িই এখানে শুটিংয়ের জায়গা। পরিচালক স্বপন আহমেদের এই সিনেমার ইংরেজি নাম দ্য অরেঞ্জ, বাংলা নাম পথের বন্ধু।
এই খবরটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে সিনেমাটির ফ্রান্সে শুটিং শুরুর খবরই শুধু জানা গিয়েছিল। এবার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শুটিংয়ের ধরন, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, শুটিং শেষের সময়সীমা এবং মুক্তির পরিকল্পনা। অর্থাৎ শুটিং শুরু থেকে শুটিংয়ের মাঝপথ পর্যন্ত ছবিটির চেহারা এখন অনেক স্পষ্ট।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রবাসী বাঙালি নাসির। ফ্রান্সে কষ্ট করে দিনযাপন করেন তিনি, পেশায় খেলনা বিক্রেতা। প্যারিসে থাকলেও খেলনা বিক্রি করতে তাঁকে যেতে হয় শহর থেকে ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে। নাসির চরিত্রে অভিনয় করছেন তৌকীর আহমেদ। তাঁর সহকারী শৈবাল চরিত্রে রয়েছেন ফাইজুল ইয়ামীন, আর নদী চরিত্রে স্বর্ণালি চৈতী।
গল্পের পেছনের ইতিহাসও জানিয়েছেন পরিচালক। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের একটি পরিবারের গল্প এটি। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তাদের গ্রাম। ১২ বছর পর দেশে ফিরে নাসির দেখতে পান বদলে যাওয়া এক বাস্তবতা। গল্পের একপর্যায়ে প্যারিসের রাস্তায় তাঁর সঙ্গে ঘটনাচক্রে নদীর দেখা হয়। পরে দর্শক জানতে পারবেন, মেয়েটিই নাসিরের মেয়ে। তবে কীভাবে এই সম্পর্কের সূত্র মেলে, সেটিই ছবির গুরুত্বপূর্ণ রহস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
শুটিংয়ের ধরন নিয়েই পরিচালকের সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য। তিনি ফ্রান্সকে পর্যটকদের পোস্টকার্ডের মতো করে দেখাতে চান না। ছবিতে আইফেল টাওয়ারের কোনো দৃশ্যই থাকছে না। তাঁর আগ্রহ মানুষের প্রতিদিনের ফ্রান্স, রাস্তাঘাট, বাজার, ছোট শহর, গ্রাম ও উপকূল। তিনজন অভিবাসীর যাত্রার সঙ্গে শহর থেকে গ্রাম, তারপর সমুদ্র পর্যন্ত ফ্রান্সের নানা ভূপ্রকৃতিও গল্পের অংশ হয়ে উঠবে।
তৌকীর আহমেদের জন্য নাসির চরিত্রটি নতুন অভিজ্ঞতা। জালালের গল্প, কমলা রকেট কিংবা রূপকথার গল্পের মতো ভিন্নধর্মী ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। এবার ইউরোপীয় কলাকুশলীদের সঙ্গে কাজ করাও তাঁর কাছে নতুন করে শেখার সুযোগ। তাঁর মতে, দর্শক তাঁকে নানাভাবে দেখেছেন, আর সেই ইমেজের বাইরে গিয়ে ভালো চরিত্রে কাজ করাটাই চ্যালেঞ্জ। চরিত্রের শুধু বাহ্যিক রূপ নয়, আত্মাটাও খুঁজে পাওয়া জরুরি।
দুই তরুণ শিল্পীর জন্যও এই শুটিং আলাদা অভিজ্ঞতা। ফাইজুল ইয়ামীনের এটি তৃতীয় চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি রায়হান রাফীর প্রেশার কুকার ও ওয়াহিদ আনামের তাজমহল সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ফ্রান্সে প্রথমবার এসে প্রতিদিন নতুন জায়গায় শুটিং করাকে তিনি ভ্রমণের মতো অভিজ্ঞতা বলেছেন। স্বর্ণালি চৈতীর এটি পঞ্চম চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি অন্তরখোলা, কুরকাব, সখী রঙ্গমালা ও আন্ধার সিনেমায় অভিনয় করেছেন। পথের বন্ধু দিয়ে দেশের বাইরে প্রথমবার সিনেমার শুটিং করছেন তিনি।
বাস্তব লোকেশনে শুটিংয়ের চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রতিদিন নতুন জায়গায় যেতে হচ্ছে, সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘ যাত্রা ও সময়ের হিসাব। তবে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সহযোগিতায় কাজটি সহজ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক। যে শহরে শুটিং হচ্ছে, সেখানকার মেয়রও কখনো কখনো উপস্থিত থাকছেন।
এরপর কী হবে, সে পরিকল্পনাও জানা গেছে। আগামী ২ নভেম্বরের মধ্যে শুটিং শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তারপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি পাঠানো হবে। এরপর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। লাল টিপ ও পরবাসিনীর পর স্বপন আহমেদের তৃতীয় চলচ্চিত্র এটি। আগের দুটি সিনেমায় বাণিজ্যিক ধারায় কাজ করলেও এবার নিজের পছন্দের চলচ্চিত্রভাষায় গল্প বলতে চান তিনি।
প্রযোজনার দিকটাও উল্লেখযোগ্য। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটি প্রযোজনা করছে ফ্রান্সের মোমার্ত মোশন পিকচার্স ও শ্যানন ইন্টারন্যাশনাল। সহযোগী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের বাগার প্রোডাকশনস। ছবির নারী নির্বাহী প্রযোজক মালিহা আহমেদ। প্রবাসজীবনের বাস্তবতা, সংগ্রাম ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ছবিটি তৈরি হচ্ছে, আর ফ্রান্সের ২৫ শহরের বাস্তব পথঘাট সেই গল্পেরই অংশ হয়ে উঠছে।
