ভূমিকা
চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে পাহাড়ের কোলে শান্ত এক হ্রদ, আবার সেই হ্রদকে ঘিরেই রোমাঞ্চকর রাইডের বিনোদনকেন্দ্র: এমন জায়গা দেশে খুব কমই আছে। নগরের খুলশী এলাকার ফয়'স লেক ঠিক এমনই এক গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য আর আধুনিক বিনোদন একসঙ্গে মিলেছে। একদিকে সবুজ পাহাড়ঘেরা হ্রদের শান্ত পানি, অন্যদিকে রোলার কোস্টারের গর্জন আর ওয়াটার পার্কের হইচই। পরিবার নিয়ে দিনভর সময় কাটানোর জন্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঠিকানাগুলোর একটি এই ফয়'স লেক। ইতিহাসটা মজার: ১৯২৪ সালে তৎকালীন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এই হ্রদ খনন করা হয়, তখন এর নাম ছিল পাহাড়তলী লেক। পরে ফয় নামে এক ইংরেজ রেল প্রকৌশলীর নামে এর নামকরণ করা হয়। প্রায় ৩৩৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই হ্রদকে কেন্দ্র করে ২০০৪ সালে গড়ে তোলা হয় বিনোদন পার্ক, যার পরিচালনায় আছে কনকর্ড গ্রুপ।
কেন যাবেন
ফয়'স লেক যাওয়ার প্রথম কারণ এক জায়গায় দুই ধরনের অভিজ্ঞতা। যারা শান্তিতে প্রকৃতি দেখতে চান, তারা হ্রদের পাড়ে হেঁটে বা নৌকায় ঘুরে সময় কাটাতে পারেন। আবার যারা রোমাঞ্চ খোঁজেন, তাদের জন্য আছে নাগরদোলা, রোলার কোস্টার, বাম্পার কার, পাইরেট শিপসহ নানা রাইড। শিশুদের জন্য দোলনা ও নানা রাইডের ব্যবস্থা আছে, ফলে ছোটদের নিয়ে পরিবারিক ভ্রমণের জন্য এটি দারুণ উপযোগী। পানিপ্রেমীদের জন্য আছে সি ওয়ার্ল্ড নামে ওয়াটার থিম পার্ক, যেখানে সারা দিন পানি নিয়ে মাতামাতি করা যায়। আর নতুন সংযোজন বেজক্যাম্পে জিপলাইনে হ্রদ দেখা, গাছে ঝুলে রোমাঞ্চকর যাত্রা, কায়াকিং ও আর্চারির মতো অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটি রয়েছে। সব বয়সী মানুষের জন্য কিছু না কিছু থাকায় এটি সবার জন্য উপযোগী গন্তব্য।
সেরা সময়
ফয়'স লেক ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় রোদ ঝলমলে থাকে, হ্রদের পাড়ে হাঁটাচলা আরামদায়ক হয়, আর রাইডগুলো উপভোগ করতেও স্বস্তি লাগে। বর্ষায় চারপাশ সবুজ হয়ে ওঠে ঠিকই, তবে পথ পিচ্ছিল থাকতে পারে। সপ্তাহান্তে ও সরকারি ছুটির দিনে এখানে প্রচুর ভিড় হয়, টিকিটের লাইনে দাঁড়াতে হয়। নিরিবিলি ঘুরতে চাইলে সপ্তাহের মাঝামাঝি কোনো কর্মদিবস বেছে নিন। সকাল সকাল গেলে ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, আর রাইডগুলোতেও অপেক্ষা কম হয়।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে প্রথমে যেতে হবে চট্টগ্রাম, বাস, ট্রেন বা বিমানে। চট্টগ্রাম শহরের ভেতর থেকে ফয়'স লেক যাওয়া সহজ, কারণ এটি নগরের খুলশী এলাকায়, পাহাড়তলী রেলস্টেশনের কাছাকাছি। শহরের জিইসি মোড়, ষোলশহর বা আগ্রাবাদ থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সরাসরি ফয়'স লেকের ফটকে যাওয়া যায়। বাসেও যাওয়া সম্ভব। নিজস্ব গাড়ি থাকলে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা থেকে দিনে দিনে ঘুরে ফেরা সম্ভব হলেও, সি ওয়ার্ল্ড ও বেজক্যাম্পসহ পুরোটা উপভোগ করতে চাইলে সকাল সকাল পৌঁছানোর পরিকল্পনা করুন।
কী কী দেখবেন ও করবেন
ফয়'স লেকের মূল ফটক দিয়ে ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়বে পাহাড়ঘেরা হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি। নৌকা ভ্রমণে হ্রদের বুকে ঘোরা এখানকার ক্লাসিক অভিজ্ঞতা, নৌকা থেকে দুই পাশের সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। বিনোদন পার্কের রাইডগুলোর মধ্যে আছে নাগরদোলা, রোলার কোস্টার, বাম্পার কার, পাইরেট শিপ ও শিশুদের দোলনা। সি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার পার্কে পানির নানা রাইডে সারা দিন কাটানো যায়, গরমের দিনে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। বেজক্যাম্পে জিপলাইনে হ্রদের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া, কায়াকিং, আর্চারি আর দৈত্যাকার দোলনায় দোল খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, জিপলাইন ও দোলনা ব্যবহারের জন্য আলাদা ফি দিতে হয় না। হ্রদের পাড় ধরে হাঁটার পথে ছবি তোলার দারুণ সব স্পট আছে। ফয়'স লেকের পাশেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, বাঘ সিংহ ভালুকসহ নানা পশুপাখি দেখতে সেখানেও ঢুঁ মারা যায়।
টিকিট ও খরচ
ফয়'স লেকে প্রবেশের টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা, এর বাইরে বিভিন্ন রাইডের জন্য আলাদা টাকা গুনতে হয়। সি ওয়ার্ল্ড ও বেজক্যাম্পের জন্যও পৃথক ফি দিতে হয়। মূল ফটক দিয়ে ঢুকে নৌকায় করে সি ওয়ার্ল্ডে গিয়ে সব রাইড উপভোগের ফি ৭০০ টাকা, তবে সরাসরি পৃথক ফটক দিয়ে সি ওয়ার্ল্ডে ঢুকলে জনপ্রতি ৫০০ টাকা। বেজক্যাম্পের প্রবেশ ফি ৫০০ টাকা। আগে থেকে বুকিং দিয়ে দলবদ্ধভাবে (কমপক্ষে ১০ জন) গেলে প্রবেশ ফির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়: ৫০০ টাকার বিনিময়ে প্রবেশ ফির সঙ্গে পাঁচটি রাইড উপভোগের সুযোগ থাকে। মনে রাখবেন, এই দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই যাওয়ার আগে ফয়'স লেকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিন। বাজেট ভ্রমণে শুধু লেক ঘোরা, নৌকা ভ্রমণ ও কয়েকটি রাইড মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ পড়ে আনুমানিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। সি ওয়ার্ল্ড বা বেজক্যাম্পসহ পুরো দিনের পরিকল্পনায় মাঝারি বাজেটে খরচ দাঁড়ায় ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মতো।
কোথায় থাকবেন
ফয়'স লেকে রাতযাপনের সুযোগও রয়েছে, লেকের পাড়ে পাহাড়ের কোলে কটেজ ও রিসোর্টের ব্যবস্থা আছে। তবে বেশিরভাগ পর্যটক দিনের ভ্রমণেই আসেন। রাত থাকতে চাইলে চট্টগ্রাম শহরের হোটেলেও থাকা যায়, জিইসি, আগ্রাবাদ ও স্টেশন রোড এলাকায় বাজেট থেকে মাঝারি মানের নানা হোটেল আছে। শহরে থাকলে পরদিন পতেঙ্গা সৈকত বা পারকি সৈকত ঘুরে আসা যায়।
খাওয়া
ফয়'স লেকের ভেতরে রেস্টুরেন্ট ও খাবারের দোকানের ব্যবস্থা আছে, দিনভর ঘোরার ফাঁকে খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়া যায়। পিকনিকের মেজাজে আসলে নিজেদের খাবার সঙ্গে নিয়েও আসা যায়। স্কুল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান ও কনসার্টও এখানে হয়ে থাকে, ফলে উৎসবের মৌসুমে খাবারের আয়োজন আরও বড় আকারে থাকে।
বাজেট টিপস
খরচ বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় দল বেঁধে যাওয়া: কমপক্ষে ১০ জনের দল আগে থেকে বুকিং দিলে প্রবেশ ফি ও রাইডে ছাড় পাওয়া যায়। কোন রাইডগুলোতে উঠবেন তা আগে ঠিক করে নিন, তাতে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানো যায়। পানি ও হালকা স্ন্যাকস বাইরে থেকে নিয়ে গেলে ভেতরে বারবার কিনতে হয় না। ফয়'স লেকের অফিশিয়াল পেজে মাঝে মাঝে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা আসে, যাওয়ার আগে সেটা দেখে নিলে লাভ হতে পারে। সপ্তাহের কর্মদিবসে গেলে ভিড় কম থাকে, ফলে সময়ও বাঁচে।
নিরাপত্তা পরামর্শ
রাইডে ওঠার আগে প্রতিটি রাইডের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন, উচ্চতা বা বয়সের সীমা থাকলে তা অমান্য করবেন না। শিশুদের কখনোই একা ছাড়বেন না, বিশেষ করে পানির রাইড ও হ্রদের পাড়ে। হ্রদের পানিতে অনুমতি ছাড়া সাঁতার কাটবেন না। জিপলাইন বা কায়াকিংয়ের সময় প্রশিক্ষকদের নির্দেশ মেনে চলুন। মূল্যবান জিনিসপত্র ওয়াটার পার্কে নেওয়ার সময় ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ব্যবহার করুন। সন্ধ্যার পর পার্ক বন্ধ হয়ে গেলে অযথা এলাকায় ঘোরাঘুরি না করে ফেরার ব্যবস্থা করুন।
