ছোট পর্দার নাটক দেখার সিদ্ধান্ত অনেক সময় নেওয়া হয় এক ঝলকে, পোস্টারে দুটি নাম দেখে। সেই নাম দুটি যদি পরিচিত জুটির হয়, দর্শকের আগ্রহ তখনই বেড়ে যায়। কালের কণ্ঠের ২৯ অক্টোবরের ফিচারে এমনই কয়েকটি জুটির কথা উঠে এসেছে, যাঁদের একের পর এক কাজ ইউটিউবে কোটি কোটি ভিউ পেয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে শুধু তারকাখ্যাতি নয়, আছে পর্দার রসায়ন, গল্পের আবেদন আর ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ দেওয়ার ইতিহাস।
ফারহান আহমেদ জোভান ও তানজিম সাইয়ারা তটিনীর জুটি এই তালিকার শুরুতেই আসে। প্রেমের গল্প থেকে পারিবারিক টানাপোড়েন, নানা ধরনের চরিত্রে তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে। গত বছরের ঈদে মুক্তি পাওয়া মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের তোমাদের গল্প দর্শকের বিপুল সাড়া পায়। এরপর সম্পর্কের গল্প সেই আগ্রহ আরও বাড়ায়, জানুয়ারিতে প্রকাশিত নাটকটি অল্প সময়ের মধ্যেই তিন কোটির বেশি ভিউ অর্জন করে। জাকারিয়া সৌখিনের কাজল চোখের মেয়ে দুই সপ্তাহে প্রায় আড়াই কোটি ভিউ পায়, যেখানে প্রেমের পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আবহও ছিল। তোর মায়ায় নাটকটিও দর্শকের নজর কেড়েছে। একের পর এক ভিন্ন স্বাদের গল্পে এই জুটির উপস্থিতিই তাঁদের ভরসার নাম করে তুলেছে।
জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও নাজনীন নীহার জুটি তুলনামূলক নতুন হলেও দ্রুত দর্শকের সাড়া পেয়েছে। অপূর্ব দীর্ঘদিন ধরেই টেলিভিশন নাটকের পরিচিত মুখ, তাঁর সঙ্গে নীহার জুটির পরিচিতি বাড়ায় জাকারিয়া সৌখিন পরিচালিত মনদুয়ারী, সেপ্টেম্বরে যার ভিউ চার কোটি ছাড়িয়ে যায়। এরপর মেঘবালিকা, ঘ্রাণ সহ কয়েকটি নাটকে তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে। অক্টোবরের শেষ দিকে মুক্তি পাওয়া ভালো আছো তো? নাটকটি দুই দিনের মধ্যেই কোটি ভিউ অতিক্রম করে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, সাবলীল সংলাপ ও আবেগনির্ভর উপস্থাপনাই এই নাটকের দর্শকপ্রিয়তার কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। নতুন জুটি হয়েও এত দ্রুত এত বড় সাড়া পাওয়া সহজ নয়, আর সেটাই এই জুটিকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমির জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি পারিবারিক গল্প ও হাস্যরস। তাঁদের অভিনীত শ্বশুরবাড়িতে ঈদ, মামার বাড়ি, সংসার আমার ভাল্লাগে না, গরিবের বড়লোক চাকর ও চাচা ভাতিজা জিন্দাবাদ ইউটিউবে কোটি কোটি ভিউ পেয়েছে। এ বছরের বিভিন্ন ভিউ তালিকায় তাঁদের একাধিক নাটকের উপস্থিতি এই জুটির দীর্ঘস্থায়ী দর্শকপ্রিয়তার প্রমাণ। এই জুটির শক্তি হলো, দর্শক তাঁদের শুধু রোমান্টিক চরিত্রে দেখেন না। দাম্পত্যের খুনসুটি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতিতেও তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে একই জুটিকে ঘিরে নতুন গল্প তৈরির সুযোগ পান নির্মাতারা, আর দর্শকও নতুন গল্পে পুরোনো মুখ খুঁজে পান।
খায়রুল বাসার ও সাদনিমা বিনতে নোমানের জুটিও সাম্প্রতিক সময়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি করেছে। সেরনিয়াবাত শাওন পরিচালিত তোমার ঠিকানায় নাটকটি ২৪ সেপ্টেম্বর ইউটিউবে প্রকাশিত হয়, এর ভিউ এক কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর আগে তাঁদের কাছের কেউ নাটকটিও দর্শকের সাড়া পেয়েছিল। এই জুটির জনপ্রিয়তার গুরুত্ব শুধু ভিউয়ের সংখ্যায় নয়, নতুন অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রেও। প্রতিষ্ঠিত তারকাদের বাইরেও যে কোনো জুটি দর্শকের মনোযোগ পেতে পারে, তাঁদের সাফল্য তার একটি উদাহরণ। নতুন মুখের প্রতি দর্শকের এই আস্থা ছোট পর্দার জন্য আশার কথা, কারণ এতে নতুন গল্প ও নতুন মুখের জায়গা তৈরি হয়।
ইয়াশ রোহান ও তানজিম সাইয়ারা তটিনীর জুটিও দর্শকের কাছে পরিচিত। তাঁদের অভিনীত হৃদয়ে রেখেছি গোপনে এ বছর দুই কোটির বেশি ভিউ পাওয়া নাটকগুলোর মধ্যে একটি, যার গল্পে রয়েছে না বলা ভালোবাসা ও পারিবারিক সম্পর্কের আবেগ। তটিনী একাধিক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। জোভান ও ইয়াশ রোহানের সঙ্গে পর্দায় তাঁর রসায়ন ভিন্ন ধরনের গল্পের সুযোগ তৈরি করেছে। এতে বোঝা যায়, একজন অভিনয়শিল্পীর জনপ্রিয়তা সব সময় একটি নির্দিষ্ট জুটির ওপর নির্ভর করে না, বরং ভিন্ন সহশিল্পীর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বড় পর্দা ও ওয়েব কনটেন্টেও জুটির গুরুত্ব কম নয়। দেশের চলচ্চিত্রে শুরু থেকেই জুটি প্রথা রয়েছে, রাজ্জাক-কবরী, আলমগীর-শাবানা, সালমান শাহ-শাবনূর, শাকিব খান-অপু বিশ্বাস, এমন অসংখ্য জুটির ছবি তাঁদের অভিনয় ও পর্দার রসায়নের কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আফরান নিশো ও তমা মির্জার সুড়ঙ্গ দর্শকের কাছে তাঁদের পর্দার রসায়নকে পরিচিত করেছে। অন্যদিকে শাকিব খান ও ইধিকা পালের প্রিয়তমা বাণিজ্যিক সিনেমায় জুটির জনপ্রিয়তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে চলচ্চিত্রে একটি জুটির সাফল্যকে শুধু দর্শকসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। সিনেমার গল্প, নির্মাণ, প্রচারণা, মুক্তির সময় ও প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের সুযোগও ব্যবসায়িক ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ওয়েব কনটেন্টের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, পরিচিত জুটি দর্শক টানতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দর্শক ধরে রাখতে প্রয়োজন মানসম্মত কাজ।
পরিচিত জুটির প্রতি দর্শকের আস্থা তৈরি হয় ধারাবাহিক সাফল্য, পর্দার রসায়ন ও গল্পের আবেদনে। তোমাদের গল্প, সম্পর্কের গল্প, মনদুয়ারী কিংবা শ্বশুরবাড়িতে ঈদের মতো নাটকের জনপ্রিয়তা সেই আস্থারই প্রতিফলন। তবে পরিচিত মুখ দর্শককে পর্দার সামনে টানতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখে গল্প ও নির্মাণের মান। তাই দর্শকের ভরসার নাম হয়ে ওঠা জুটিগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সাফল্যের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং প্রতিবার নতুন গল্পে সেই আস্থার মর্যাদা রাখা। দর্শক এখন এই জুটিগুলোর পরের কাজের দিকে তাকিয়ে থাকবেন, আর সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে তাঁদের আসল পরীক্ষা।
