বিনোদন ঝলক
সিনেমা

২ দিন পর বিশ্বব্যাপী মুক্তি 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'র: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ ৫ দেশে, পরিবেশনায় হোমবেল ফিল্মস

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২১ অক্টোবর ২০২৬4 মিনিটে পড়ুন
২ দিন পর বিশ্বব্যাপী মুক্তি 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'র: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ ৫ দেশে, পরিবেশনায় হোমবেল ফিল্মস
'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'র পরিচালক ও অভিনেতা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (ছবি: ছবি: Arghyaks, CC BY-SA 4.0)

দুর্গাপূজায় পশ্চিমবঙ্গে মুক্তির ঠিক আট দিন পর এবার বিশ্বের দরবারে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলা সিনেমা 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'। ২৩ অক্টোবর, অর্থাৎ আর মাত্র দুই দিন পর আন্তর্জাতিক পরিবেশক প্রত্যঙ্গিরা সিনেমাসের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই ছবি। একই সঙ্গে 'কেজিএফ' ও 'কান্তারা'র মতো ব্লকবাস্টারের প্রযোজনা সংস্থা হোমবেল ফিল্মস ছবিটির বৈশ্বিক পরিবেশনা স্বত্ব কিনে নিয়েছে, যা টলিউডের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হোমবেল ফিল্মসের এই সিদ্ধান্তকে বাংলা সিনেমার জন্য বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন নির্মাতারা। বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় পরিচালক নন্দিতা রায় বলেন, এটি তাঁদের জন্য গর্বের মুহূর্ত; পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও বাংলা ছবি পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের স্বপ্ন। তাঁর ভাষ্য, হোমবেল ফিল্মসই প্রথম তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৈশ্বিক পরিবেশনার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ছিল আনন্দের চমক। সহপরিচালক ও প্রধান অভিনেতা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, হোমবেল যখন জানাল তারা ছবিটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে আগ্রহী, সেটি ছিল গর্বের মুহূর্ত। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এটি বড় লাফ, যা নতুন দরজা খুলে দেবে।

মুক্তির সময়সূচিটিও সাজানো হয়েছে ধাপে ধাপে। ১৫ অক্টোবর দুর্গাপূজার মৌসুমে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পায় ছবিটি, এরপর ভারতের বাকি অংশে। আর ২৩ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্ব। যুক্তরাষ্ট্রে তো মুক্তির দুই মাস আগেই অগ্রিম বুকিং শুরু হয়েছিল, যা শিবপ্রসাদের ক্যারিয়ারে প্রথম। কানেকটিকাটের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সংস্থার উদ্যোগে ১৫ নভেম্বর বোস্টনে ও ২২ নভেম্বর কানেকটিকাটে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু প্রবাসী বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছানোর পরিকল্পনা স্পষ্ট।

অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত বদলটি হলো পুলিশ অফিসারের চরিত্রে যিশু সেনগুপ্তের আগমন। প্রথম পর্বে এই ভূমিকায় ছিলেন আবির চট্টোপাধ্যায়; সিক্যুয়েলে তাঁর জায়গায় যিশু। বিক্রম প্রামাণিক ওরফে বহুরূপীর চরিত্রে ফিরছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজে, তাঁর স্ত্রী ঝিমলির ভূমিকায় কৌশানী মুখোপাধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন সোহিনী সরকার, রজতাভ দত্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও চন্দন সেনসহ অনেকে। প্রায় তিন মিনিটের অফিশিয়াল ট্রেলারে যিশু ও শিবপ্রসাদের মুখোমুখি সংঘাতই মূল আকর্ষণ।

গল্পের কেন্দ্রে এবার একটি দুঃসাহসিক সোনার ডাকাতি। একটি জুয়েলারি দোকানে সংঘটিত বড়সড় ডাকাতিকে ঘিরে আইন ও পলাতক অপরাধীর মধ্যে চলছে বেড়াল-ইঁদুর খেলা। বিক্রম প্রামাণিক বারবার ছদ্মবেশ বদলে পুলিশকে ধোঁকা দেন, আর তাঁকে ধরতে মরিয়া পুলিশ অফিসারের চরিত্রে যিশু। ট্রেলার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু অ্যাকশন নয়, প্রেম, পারিবারিক আবেগ, বিশ্বাসঘাতকতা ও দ্বিমুখী চালও গল্পের বড় অংশ। পাশাপাশি আছে লোকসংগীতনির্ভর নাচের দৃশ্য, আর গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বহুরূপী শিল্পের ছদ্মবেশ-সংস্কৃতির উদযাপন। মালদার গম্ভীরা শিল্পীদের গান, মুখোশ ও পরিবেশনা ছবিতে এনেছে আলাদা সত্যতা, যা নির্মাতাদের ভাষায় কেবল পুনর্নির্মাণে আনা যায় না।

যারা প্রথম পর্ব দেখেননি, তাঁদের জন্য সংক্ষেপে পেছনের গল্প। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া 'বহুরূপী' ছিল বাংলা সিনেমার অন্যতম বড় হিট। সেখানে বিক্রম প্রামাণিক ছিলেন একজন সৎ ব্যাংক কর্মকর্তা, যিনি অবিচারের শিকার হয়ে ডাকাতির পথ বেছে নেন। ছদ্মবেশে পারদর্শী এই চরিত্র দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে। সিক্যুয়েলে সেই চরিত্রই ফিরেছে আরও বড় পরিসরে, আরও বড় ঝুঁকি নিয়ে। নির্মাতাদের ভাষায়, প্রথম ছবির সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় আত্মা ধরে রেখেই এবার জগৎটাকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।

নির্মাণের পরিসরও ছিল চমকপ্রদ। পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদ, টাকি, বারাসাত, বর্ধমান, বোলপুর, বিষ্ণুপুর, মালদাসহ ৯৬টি লোকেশনে শুটিং হয়েছে, অংশ নিয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার শিল্পী। নির্বাচনের কারণে শুটিংয়ের সূচি পেছাতে হয়েছিল, আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শুটিং ছিল কঠিন পরীক্ষা। তবু কলাকুশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিবপ্রসাদ। প্রথম ঝলকের পোস্টারে তাঁর রুক্ষ নতুন লুক দেখে দর্শকের কৌতূহল আরও বেড়েছিল।

ডিজিটাল দিকটাও উল্লেখযোগ্য। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই ছবির ডিজিটাল স্ট্রিমিং স্বত্ব কিনে নিয়েছে Sony Aath ও SonyLIV। পূজার মৌসুমে মুক্তি পাওয়া বড় বাংলা ছবির ক্ষেত্রে এটি ব্যবসায়িক মডেলের উল্লেখযোগ্য বদল, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে প্রেক্ষাগৃহের ফলের ওপরই নির্ভর করত ডিজিটাল স্বত্বের দাম। 'দেশু ৭'-এর সঙ্গেও একই সময়ে এই চুক্তি হলেও দুই ছবির বাণিজ্যিক কৌশল ছিল আলাদা। ফলে প্রেক্ষাগৃহ পর্ব শেষে দর্শক SonyLIV-এ ছবিটি দেখতে পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

প্রাথমিক দর্শক-প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক দিকে। সামাজিক মাধ্যমে আগাম দেখা দর্শকদের মন্তব্যে প্রশংসিত হয়েছে বড় পরিসর, কেন্দ্রীয় দ্বৈরথ আর উৎসবমুখর আবহ। শিবপ্রসাদের আত্মবিশ্বাসী ফেরা ও যিশুর সঙ্গে তাঁর রসায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কিছু দর্শকের মতে, প্রথম পর্বের কিছু চরিত্র-ধাঁচ ও গল্পের বাঁক চেনা লেগেছে; দ্বিতীয়ার্ধেই আসল রোমাঞ্চ বলে মত অনেকের। অর্থাৎ সিক্যুয়েল হিসেবে প্রত্যাশা যেমন বেশি, সমালোচনার চোখও তেমন তীক্ষ্ণ।

বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য আপাতত নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মুক্তির খবরে। ভারতের বাইরে প্রবাসী বাঙালিদের জন্য ২৩ অক্টোবরই বড় দিন। হোমবেল ফিল্মসের মতো প্রতিষ্ঠানের যুক্ত হওয়া প্রমাণ করে, ভাষার সীমানা পেরিয়ে বাংলা গল্প এখন বৈশ্বিক বাজারের দরজায় কড়া নাড়ছে। 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু' সেই দরজা কতটা খুলতে পারে, সেটিই এখন দেখার।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার