টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনার তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। মুম্বাই পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীরা গুগলে তারকাদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করে অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে সেসব এলাকায় গিয়ে নজরদারি চালাত। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন তিন হামলাকারী রেহান আনসারি, ফুল সিং ও ঋত্বিককে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত।
তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি, হামলাকারীদের প্রথম লক্ষ্য ছিলেন সালমান খান। এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা মুম্বাইয়ে এসে প্রথমে সালমানের বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের আশপাশে যান। সেখানে পুলিশ ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি দেখে তারা পরিকল্পনা বদলে থাকতে পারেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা। তবে সালমানই মূল লক্ষ্য ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
পরে তাদের নজর পড়ে টাইগার শ্রফের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনেতা ও তার ভক্তদের পোস্ট করা ভিডিও দেখে তারা জানতে পারেন, টাইগার নিয়মিত জুহুর একটি মাঠে ফুটবল খেলতে যান। সেখানে তার সঙ্গে তুলনামূলক কম নিরাপত্তারক্ষী থাকেন বলেও ধারণা করেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর অনুযায়ী, হামলার অন্তত ১০ দিন আগে থেকে মাঠটির আশপাশে নজরদারি চালানো হয়েছিল। ১১ অক্টোবরও সেখানে গিয়েছিলেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। কিন্তু সেদিন টাইগার মাঠে না আসায় হামলা হয়নি। এক সপ্তাহ পর, ১৮ অক্টোবর, তার গাড়িতে গুলি চালানো হয়। সেদিন টাইগার অক্ষত থাকলেও তার গাড়িচালক ও এক অটোরিকশাচালক আহত হন।
তবে নজরদারি শুধু সালমান বা টাইগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তি মুম্বাইয়ে অবস্থানকালে সালমান ছাড়াও আমির খান ও রণবীর সিংয়ের বাড়ির আশপাশে গিয়েছিলেন। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, তাদের হামলার লক্ষ্য হিসেবে এসব তারকার নাম দেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কারণে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের এই চলাফেরার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য অন্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
হামলার তদন্তে অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থ লেনদেনের একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমৃতসর থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের পর তা দিল্লিতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাধা ভার্মা ও ববিতা রাও নামের দুই নারী অস্ত্রটি মুম্বাইয়ে পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ। পুলিশ জানিয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজে কয়েকজনের আলাদা ভূমিকা ছিল। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা যাতে একে অপরের পরিচয় না জানতে পারেন, সে জন্য অস্ত্র হস্তান্তরে বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের কাছে প্রায় দুই লাখ রুপি পৌঁছানোর তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এর মধ্যে ২৫ হাজার রুপিতে একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কেনা হয় বলে পুলিশের দাবি। অর্থের কিছু অংশ ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। হামলার পর ব্যবহৃত অস্ত্র ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মুঠোফোনও নষ্ট করা হয়েছে।
হামলার পরিকল্পনায় অনিল পণ্ডিত নামের এক ব্যক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তার সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ। তদন্তে গ্যাংটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত শুভম লোঙ্কারের নামও উঠে এসেছে। টাইগারের গাড়িতে গুলির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে নিজেকে অনিল পণ্ডিত পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি হামলার দায় স্বীকার করেন। তবে বার্তাটির সত্যতা এবং বক্তার পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নতুন তথ্য সামনে আসার পর সালমানের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। এনডিটিভি জানিয়েছে, তার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে অত্যাধুনিক সাবমেশিনগানসহ বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে। সালমান আগে থেকেই ওয়াই-প্লাস নিরাপত্তা পান। তার চলাফেরার সময় সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা সঙ্গে থাকেন। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীও। তার মতে, চলচ্চিত্রজগৎ দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধী চক্রের সহজ লক্ষ্য হয়ে আছে।
সালমানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় তার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গুলি চালানো হয়। ওই বছরের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে গুলিতে নিহত হন সালমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি। দুটি ঘটনাতেই বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। টাইগারের ওপর হামলার আগে চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে গুলিবর্ষণ এবং অভিনেতা রণবীর সিংকে চাঁদা চেয়ে হুমকির অভিযোগও সামনে আসে।
টাইগারের গাড়িতে হামলার ঘটনায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত ও অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই চলছে। একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, অন্য তারকাদের ওপর হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সালমানসহ বলিউডের একাধিক তারকাকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটছে না।
