ঢাকাই সিনেমায় আবারও চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের টানাপোড়েন সামনে এলো। অভিনেতা শরিফুল রাজের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ, এক্সক্লুসিভিটি চুক্তি লঙ্ঘন এবং আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তুলে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রিয়েল এনার্জি প্রোডাকশন। প্রতিষ্ঠানটির আসন্ন ঈদুল আজহার ছবি ঠিকানাকে ঘিরেই এই বিরোধ। নোটিশে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুটিংয়ের শিডিউল নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, তা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ঠিকানার প্রযোজক ও রিয়েল এনার্জি প্রোডাকশনের স্বত্বাধিকারী শাহরিন আক্তারের পক্ষে নোটিশটি পাঠিয়েছেন ব্যারিস্টার সজিব মাহমুদ আলম। নোটিশ পাঠানোর তারিখ ২৮ অক্টোবর। খবরটি প্রকাশ্যে আসে ৩১ অক্টোবর, আর সঙ্গে সঙ্গে ঢালিউড অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। কারণ শরিফুল রাজ এখন একসঙ্গে একাধিক সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত, আর ঈদের মুক্তিকে ঘিরে তার প্রতিটি ছবির শিডিউলই দর্শক ও প্রযোজকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
নোটিশের অভিযোগের কেন্দ্রে আছে দুটি বিষয়। প্রথমত, ঠিকানার শুটিংয়ের জন্য রাজ এখনো কোনো তারিখ দেননি বলে দাবি করেছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয়ত, একই ঈদুল আজহায় মুক্তির কথা জানিয়ে অন্য একটি ছবির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি, যা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই দুটি অভিযোগ মিলেই তৈরি হয়েছে পুরো আইনি জটিলতা।
চুক্তির বিষয়ে নোটিশে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রিয়েল এনার্জি প্রোডাকশনের সঙ্গে শরিফুল রাজের ঠিকানা ছবিতে অভিনয়, প্রচার ও প্রচারণাসহ বিভিন্ন শর্তে একটি আর্টিস্ট সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি অগ্রিম পারিশ্রমিকও নিয়েছেন বলে নোটিশে বলা হয়েছে। চুক্তির ৯ নম্বর ধারায় ঠিক হয়েছিল, ছবিটি ২০২৭ সালের ঈদুল আজহা বা তার পরে মুক্তি পাবে। আর ৪.১১ ধারায় বলা আছে, ঠিকানার মুক্তির সময়ে শিল্পীর প্রধান বা উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনীত অন্য কোনো প্রজেক্ট মুক্তি পাবে না।
বিরোধের সূত্রপাত গত ৩১ আগস্টের একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে। ওই দিন শরিফুল রাজ জানান, তিনি কানাভুলা প্যারাডক্স নামের একটি ছবিতে অভিনয় করেছেন, যেটিও আগামী ঈদুল আজহায় মুক্তির কথা। নোটিশের দাবি, ওই পোস্টের পর ঠিকানার স্পনসর ও অংশীজনেরা সরে যেতে চাইছেন। অর্থাৎ একই ঈদে দুটি ছবি মুক্তির ঘোষণা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্যিক ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন তারা।
এটি এই বিরোধের প্রথম নোটিশ নয়। গত ২ সেপ্টেম্বর প্রথম নোটিশ পাঠিয়ে চারটি দাবি জানানো হয়েছিল। সেগুলো ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির প্রচার বন্ধ করা, ফেসবুক পোস্ট সরিয়ে নেওয়া, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং চুক্তি মেনে চলার লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া। নোটিশে বলা হয়েছে, ওই নোটিশের পর শিল্পী ও তার ম্যানেজার সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টি সমঝোতায় মেটানোর কথা দিলেও শুটিংয়ের কোনো সময়সূচি দেননি। সেই কারণেই দ্বিতীয় দফায় আবার আইনি নোটিশ পাঠাতে হয়েছে বলে দাবি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের।
নতুন নোটিশে শুটিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়ও চাওয়া হয়েছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত শুটিংয়ের সময় চেয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহায় মুক্তি দিতে হলে পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য দুই মাস সময় লাগবে। অর্থাৎ শুটিং যত দেরি হবে, মুক্তির পরিকল্পনাও তত পেছাবে, আর সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রতিষ্ঠানটি।
এই বিষয়ে শরিফুল রাজের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য মেলেনি, এমনকি একটি প্রতিবেদনে তার নম্বর বন্ধ পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। ফলে প্রযোজকের তোলা অভিযোগের বিষয়ে অভিনেতার অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। এখানে মনে রাখা জরুরি, এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ ও নোটিশের বক্তব্য, আদালতের কোনো রায় নয়।
বিরোধটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে ঈদকেন্দ্রিক ঢালিউডের বাস্তবতাটা দেখতে হবে। ঈদে মুক্তি মানেই বড় বাজেট, বড় প্রত্যাশা আর হলে দর্শকের চাপ। একই অভিনেতার দুটি ছবি একই ঈদে মুক্তি পেলে দর্শক ভাগ হয়ে যায়, প্রচারের মনোযোগও ভাগ হয়। সেই কারণেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিতে এক্সক্লুসিভিটির ধারা রাখে। আবার শিল্পীর দিক থেকে দেখলে, একাধিক ছবিতে কাজ করা তার ক্যারিয়ারেরই অংশ। এই দুই স্বার্থের সংঘাত থেকেই এমন বিরোধ তৈরি হয়, আর ঠিকানার ক্ষেত্রেও সেই পুরোনো টানাপোড়েনই নতুন করে সামনে এসেছে।
এরপর কী হবে, তা এখন নির্ভর করছে আগামী ৪৮ ঘণ্টার ওপর। এই সময়ের মধ্যে শরিফুল রাজ শুটিংয়ের শিডিউল নিশ্চিত করলে সমঝোতার পথ খোলা থাকবে। আর সন্তোষজনক জবাব না এলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে। অন্যদিকে রাজের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য এলে পুরো ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে। ঠিকানা কি ২০২৭ সালের ঈদুল আজহাতেই মুক্তি পাবে, নাকি এই বিরোধ ছবির ভবিষ্যৎ বদলে দেবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন অপেক্ষা করছে আগামী দুই দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
