বলিউডে স্বজনপ্রীতি নিয়ে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই, আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে বারবার ঘুরে আসে তারকা সন্তানদের নাম। এবার সেই আলোচনায় নিজের অবস্থান খোলাখুলি জানালেন সারা আলী খান। সম্প্রতি ফিল্মফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন, তারকা পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি কিছু সুবিধা পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, সেই সুবিধার মানে এই নয় যে বাবা সাইফ আলী খান তাঁর হয়ে নির্মাতাদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন।
সারার কথায়, নিজের পরিচয় নিয়ে সরল বা বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কোনো কারণ নেই তাঁর। তারকা পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর সামনে কিছু দরজা খুলেছে, সুযোগ এসেছে, পরিচিতি আর খ্যাতি মিলেছে, এমনকি অভিনেত্রী হওয়ার আগেই। এই স্বীকারোক্তির পরেই তিনি নিজের আপত্তির জায়গাটাও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, স্বজনপ্রীতি শব্দটি এখন এমন এক নেতিবাচক তকমায় পরিণত হয়েছে, যা একজন শিল্পীর নিজের পরিশ্রমকে আড়াল করে দেয়।
এই বিতর্ক সারার জন্য নতুন নয়। অভিনয় জীবনের আট বছর পার করেও তাঁকে বারবার একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। চলতি বছর তিনি অভিনয় করেছেন দুটি ছবিতে, মুদাসসার আজিজের রোমান্টিক কমেডি পতি পত্নী অউর ওহ দো এবং আকাশ কৌশিকের স্পাই কমেডি উড়তা তীর। দুটি ছবিতেই তাঁর সহশিল্পী আয়ুষ্মান খুরানা। তবু স্বজনপ্রীতির সুবিধা নিয়ে সমালোচনা তাঁর পিছু ছাড়েনি। সারার প্রশ্ন, আট বছর কাজ করার পরও যদি তাঁকে বারবার একই ব্যাখ্যা দিতে হয়, তাহলে সেই দায়ভার শুধু তাঁর ওপর চাপানো কতটা ন্যায্য।
সাক্ষাৎকারে সারা শুধু নিজের পক্ষেই কথা বলেননি, একই ধরনের সমালোচনার মুখে থাকা সমসাময়িকদের পাশেও দাঁড়িয়েছেন। জাহ্নবী কাপুর ও অনন্যা পান্ডের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, কে কার ঘরে জন্ম নেবে, তা কেউ নিজে বেছে নেয়নি। তাঁর যুক্তি, সৌভাগ্যবান হয়ে জন্ম নেওয়া কোনো দোষ নয়, আর সেই কারণে শাস্তি পাওয়াও ন্যায্য নয়। জাহ্নবী প্রয়াত অভিনেত্রী শ্রীদেবী ও প্রযোজক বনি কাপুরের মেয়ে, অনন্যার বাবা অভিনেতা চাঙ্কি পান্ডে। সারা মনে করেন, এই পরিচয় তাঁদের কাজের মূল্যায়নকে ঢেকে দেওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশে এসে সারা তাঁর পারিবারিক পরিস্থিতির কথা তুলেছেন। সাইফ আলী খান ও অমৃতা সিং ২০০৪ সালে আলাদা হয়ে যান, তখন সারার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। এরপর তিনি মূলত মা অমৃতা সিংয়ের সঙ্গেই বড় হয়েছেন। সারার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর এমন কোনো বাবা ছিলেন না, যিনি বিভিন্ন অফিসে গিয়ে তাঁর চুক্তি নিয়ে দর কষাকষি করেছেন কিংবা নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ করে তাঁকে সিনেমায় নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে তিনি কেদারনাথের সময়ের কথা টেনেছেন। ২০১৮ সালে অভিষেক কাপুর পরিচালিত কেদারনাথের মাধ্যমেই বলিউডে অভিষেক হয় সারার। সেই সময়ের কথা মনে করে তিনি বলেছেন, কেদারনাথ নিয়ে যখন সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তখন তিনি নিজেই সেটা সামলাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কেউ ছিল না। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কোনো গডফাদারই ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি, আর এই বাস্তবতার দুটি দিকই আছে বলে মনে করেন।
কেদারনাথের সেই জটিলতার পেছনের গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। ছবিটির শুটিংয়ে বিলম্ব হওয়ায় সারা আরেকটি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হন, আর এ ঘটনায় কেদারনাথের নির্মাতারা তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি রুপির ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। পরে বিষয়টি আদালতের বাইরে মীমাংসা হয়। পরিচালক রোহিত শেঠি তাঁর পুলিশি অ্যাকশনধর্মী সিনেমা সিম্বা থেকে সারাকে সময় বের করে দেন, যাতে তিনি কেদারনাথের শুটিং শেষ করতে পারেন। সারা স্পষ্ট করেছেন, এই বিরোধ মেটানোর পেছনে বাবা সাইফের কোনো ভূমিকা ছিল বলে যে ধারণা ছড়িয়েছে, তা ঠিক নয়।
আরেকটি তথ্যও সারার শুরুর দিনগুলোকে অন্য আলোয় দেখায়। অভিষেকের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। কেদারনাথ মুক্তির চার মাসেরও কম সময় আগে ইনস্টাগ্রামে যুক্ত হন সারা, আর মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখ ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ পর্দায় আসার আগেই তাঁর নাম মানুষের মুখে মুখে ঘুরছিল, আর সেই পরিচিতি এসেছিল তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের হাত ধরেই, এ কথা তিনি নিজেই মানছেন।
তাহলে সারার বক্তব্যের সারকথা কী দাঁড়াল। প্রথমত, তিনি সুবিধা পাওয়ার কথা অস্বীকার করছেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করেন, সেই সুবিধা তাঁর পরিশ্রমের মূল্যায়নকে মুছে দিতে পারে না। তৃতীয়ত, ক্যারিয়ারের কঠিন মুহূর্তগুলোতে, বিশেষ করে কেদারনাথের জটিলতায়, তিনি বাবার ছায়ায় নয়, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই লড়েছেন। এই তিনটি কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্বজনপ্রীতি বিতর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অস্বস্তি।
এই সাক্ষাৎকারের পর বলিউডের স্বজনপ্রীতি বিতর্কে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়াটাই স্বাভাবিক। একদল মনে করবেন, সারা সৎভাবে নিজের সুবিধার কথা স্বীকার করেছেন। আরেকদল বলবেন, শুরুর দরজাটা খুলে যাওয়াটাই আসল সুবিধা, পরের লড়াই যত কঠিনই হোক। তবে সারা নিজে যে বার্তাটা দিতে চেয়েছেন, তা পরিষ্কার, পরিচয় দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু আট বছর ধরে টিকে থাকার দায়টা শেষ পর্যন্ত শিল্পীর নিজেরই।
