সাজেকের অবরোধ এখন আর শুধু সাজেকের খবর নয়। চার দিন ধরে সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সাজেক পরিণত হয়েছে পর্যটকশূন্য জনপদে, আর সেই ধাক্কা সরাসরি এসে লেগেছে খাগড়াছড়িতে। হোটেল মালিক, পরিবহন মালিক, চালক আর স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে। পর্যটন মৌসুমের মুখে এই স্থবিরতা যত দীর্ঘ হচ্ছে, ক্ষতির অঙ্ক ততই বাড়ছে।
যুগান্তরের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ ও নিরাপত্তার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের কারণে পাহাড়ে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাজেকগামী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন চালক ও শ্রমিকরা। সাজেকের জিপচালক ইব্রাহিম জানিয়েছেন, গাড়ি বন্ধ থাকায় তাঁদের আয় রোজগারও বন্ধ, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্ষতির চিত্রটা শুধু সাজেকের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটা বোঝা যায় সংখ্যাগুলো দেখলে। ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সদস্য উজ্জ্বল জানিয়েছেন, পর্যটন মৌসুমে সাজেককে ঘিরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা আয় হতো, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ। খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পর্যটকরা সাজেকে যেতে না পেরে ফিরে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি শহরের ৪৩টি হোটেলে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। অর্থাৎ সাজেকের রাস্তা বন্ধ থাকলেও বিলটা গুনতে হচ্ছে খাগড়াছড়ির ব্যবসায়ীদেরও।
অবরোধের পেছনের দাবিগুলোও এই প্রতিবেদনে আবার সামনে এসেছে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, এলাকায় জেএসএস (সন্তু লারমা) সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতায় স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এলাকা থেকে এসব সশস্ত্র সদস্য অপসারণসহ ৫ দফা দাবিতে মূলত এই অবরোধ চলছে। ২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে ৭০ জন আহত হওয়ার দাবি করেছে আন্দোলনকারীরা। তখন আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়।
এই অবস্থায় সংলাপের দিকে একটা দরজা খুলেছে। চলমান সংকট নিরসনে রোববার রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তিন সদস্যের একটি সংলাপ কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার সকাল ১০টায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান। সভায় সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্ক ও হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের তিন নেতা, অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, শান্তি বিজয় চাকমা ও জ্যোতির্ময় চাকমা কেরোলকে নিয়ে সংলাপ কমিটি গঠন করা হয়।
আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেছেন, সাজেকে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা যেন আর বড় না হয়, সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যাদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, তাদের সঙ্গে বসে দ্রুত এর সমাধান করা দরকার। কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেছেন, তাঁরা দ্রুত সময়ে আলোচনার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং আশা করছেন, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান হবে। এই দুটি বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রশাসন এখন সংঘাতের বদলে আলোচনার পথেই সমাধান খুঁজছে।
আন্দোলনের প্রতি সমর্থনও এদিন আরো বিস্তৃত হয়েছে। রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচটি সংগঠন সাজেকবাসীর ৫ দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিরীহ মানুষের ওপর হামলা ও মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দাবি পূরণের আহ্বান জানিয়েছে। এই সমর্থন বোঝায়, সাজেকের দাবি এখন শুধু একটি স্থানীয় কমিটির দাবি নয়, পাহাড়ের বৃহত্তর একটি অংশের কাছেও এটি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
সবচেয়ে কষ্টের গল্পগুলো অবশ্য পর্যটকদের। অবরোধের খবর না জেনে খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটক শায়লা শারমিন ও ফয়সাল আরেফিন জানিয়েছেন, সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে অন্য গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন। পাহাড়ে কিছুদিন পরপর এমন অস্থিরতার কারণে পর্যটকরা আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। একজন পর্যটকের কাছে এটা শুধু একটি ট্রিপ বাতিল হওয়া নয়, ছুটি, টিকিট আর পরিকল্পনার পুরো হিসাব উল্টে যাওয়া। ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, এই ধাক্কা যদি বারবার আসে, তাহলে শীতের মৌসুমেও পর্যটকরা সাজেকের বদলে নিরাপদ মনে হওয়া অন্য গন্তব্য বেছে নেবেন।
এরপর কী হবে, সেটা এখন নির্ভর করছে সংলাপ কমিটির আলোচনার ওপর। কমিটি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসতে পারলে এবং ৫ দফা দাবি নিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান এলে সড়ক খোলার পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সাজেক পর্যটকশূন্য আর সড়ক বন্ধ থাকছে, ততক্ষণ সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করা পর্যটকদের উচিত হবে যাত্রার আগে সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নেওয়া। বুকিং, পরিবহন আর হোটেলের টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষণা দেখে নেওয়াই এখন সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
