বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে এই ছোট্ট দ্বীপটি স্বচ্ছ নীল পানি, প্রবাল পাথরের সৈকত আর নারকেল গাছের সারির জন্য বিখ্যাত। যারা ভিড় এড়িয়ে শান্ত সমুদ্র, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত আর দ্বীপজীবনের স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য সেন্টমার্টিন দেশের সেরা গন্তব্যগুলোর একটি।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি। নভেম্বরে পর্যটকেরা দিনে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসেন, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকে, আর দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা গড়ে দুই হাজারের মধ্যে সীমিত। অর্থাৎ অক্টোবরে দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে, তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাথায় রেখে। ২০২৬-২৭ মৌসুমের নিয়ম পুনর্বিবেচনাধীন, নতুন গাইডলাইন প্রকাশিত হলে এই গাইড হালনাগাদ করা হবে।
ঢাকা থেকে প্রথমে টেকনাফ বা কক্সবাজার যেতে হয়। ঢাকার বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে টেকনাফ ও কক্সবাজারগামী সরাসরি বাস আছে, ভাড়া এসি-ননএসিভেদে ১১০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে (আনুমানিক), সময় লাগে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। একটা জরুরি হালনাগাদ: টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌ-রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ (নাব্যতা সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে)। তাই বর্তমানে কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়। জাহাজের ভাড়া শ্রেণিভেদে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে (আনুমানিক, মৌসুমভেদে বদলায়)। যাত্রার আগে জাহাজ চলাচলের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিন, বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে টিকিট আগে বুকিং করে রাখা ভালো।
দ্বীপে দেখার মতো জায়গা অনেক। ছেঁড়া দ্বীপ সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ প্রান্তে, ভাটার সময় হেঁটে বা বাইকে যাওয়া যায়, প্রবাল পাথর আর নির্জন সৈকতের জন্য বিখ্যাত। পশ্চিম সৈকতে সূর্যাস্ত আর পূর্ব সৈকতে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। স্নরকেলিং করে পানির নিচে প্রবাল ও রঙিন মাছ দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে গাইড ও সরঞ্জাম ভাড়া পাওয়া যায়। সাইকেল ভাড়া করে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখা যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। রাতে সৈকতে বসে ঢেউয়ের শব্দ শোনা, এই স্মৃতি অনেকদিন মনে থাকে। (নোট: সরকারি নির্দেশনায় সৈকতে বারবিকিউ পার্টি, রাতে আলো জ্বালানো ও উচ্চ শব্দ নিষিদ্ধ।)
থাকার জন্য দ্বীপে নানা মানের রিসোর্ট ও কটেজ আছে। সৈকতের পাশে সাধারণ কটেজ ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় পাওয়া যায়। মাঝারি মানের রিসোর্ট ৪০০০ থেকে ৮০০০ টাকা, আর প্রিমিয়াম বিচ রিসোর্টে ১০ হাজার টাকার বেশি লাগতে পারে। পিক সিজনে দাম বাড়ে, তাই আগে বুকিং করা জরুরি। খাওয়ার জন্য দ্বীপের রেস্তোরাঁগুলোতে সামুদ্রিক মাছের নানা পদ পাওয়া যায়, প্রবাল মাছ, রূপচাঁদা ও চিংড়ি বেশ জনপ্রিয়। প্রতিবেলা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা বাজেট রাখুন।
দুই দিন এক রাতের ট্রিপে জনপ্রতি আনুমানিক খরচ ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা (বাস, জাহাজ, শেয়ারিং কটেজ, সাধারণ খাবার)। একটু আরামদায়ক ট্রিপে ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা লাগতে পারে। এগুলো মৌসুমভেদে বদলায়, পিক সিজনে বেশি।
কিছু জরুরি পরামর্শ। সেন্টমার্টিনে এটিএম বুথ নেই বললেই চলে, তাই পর্যাপ্ত নগদ টাকা নিয়ে যান। বিদ্যুৎ সীমিত, পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখুন। দ্বীপটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলবেন না, প্রবাল তুলে আনবেন না। রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা বিক্রি, সৈকতে মোটরসাইকেলসহ মোটরচালিত যান এবং একবার-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। ট্যুরিজম বোর্ড স্বীকৃত পোর্টাল থেকে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট নেওয়ার নিয়ম। সাঁতার কাটার সময় সতর্ক থাকুন, অপরিচিত জায়গায় গভীর পানিতে নামবেন না। জাহাজের সময়সূচি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে, ফেরার দিন হাতে সময় রাখুন। আর স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করুন, তাদের জীবিকাই পর্যটন।
