দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ বরাবরই স্পষ্টবক্তা। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ইস্যুতে নিজের মতামত প্রকাশে কখনো পিছপা হননি তিনি। সরকারের সমালোচনা হোক কিংবা সমাজের বিভিন্ন অসংগতি, সবকিছুতেই সরব থেকেছেন। আর এই স্পষ্টবাদী অবস্থানের কারণেই পেশাগত জীবনে এর প্রভাব পড়েছে তাঁর ওপর। এমনকি অগ্রিম অর্থ দেওয়ার পরও কয়েকটি সিনেমা থেকে সরে গেছেন প্রযোজকরা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়গুলো নিয়ে মুখ খুলেছেন তাঁর স্ত্রী পনি বর্মা।
প্রকাশ রাজের কেরিয়ারটা এমনিতেই বিশাল। ১৯৯৪ সালে কে বালাচন্দরের ডুয়েট দিয়ে তামিল সিনেমায় অভিষেকের পর থেকে তিনি কাজ করেছেন তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম আর হিন্দি ছবিতে। মণি রত্নমের ইরুভার ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, কাঞ্চিভরম ছবির জন্য পেয়েছেন সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। খলনায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা, প্রায় চারশো ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু অভিনয়ের বাইরে তাঁর আরেকটা পরিচয়ও সমানভাবে চর্চিত, সেটা তাঁর রাজনৈতিক স্পষ্টবাদিতা।
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন প্রকাশ রাজ। সরকারের সমালোচনা আর সামাজিক অসংগতি নিয়ে কথা বলা তাঁর স্বভাবের অংশ। এই অবস্থানই তাঁর পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলেছে। স্ত্রী পনির ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতামতের কারণে একাধিক ছবির কাজ ও বিজ্ঞাপনের সুযোগ হারিয়েছেন তিনি। এমনকি অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরেও অনেক প্রযোজক ছবি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
পনি বর্মা জানিয়েছেন, বিয়ের শুরুর দিকে স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন তিনি। সেই ভয় আরও বেড়ে গিয়েছিল সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের হত্যার পর। প্রথম দিকে তিনি খুব ভয় পেতেন, বিশেষ করে গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুর খবর শুনে আর স্বামীকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে দেখে। পনি জানিয়েছেন, গৌরী লঙ্কেশ নিজেও প্রকাশ রাজের স্পষ্টবাদী স্বভাব নিয়ে চিন্তিত থাকতেন, প্রায়ই তাঁকে সতর্ক করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু প্রকাশ রাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, নিজের অবস্থানে অনড় থাকবেন। পনির কথায়, তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি কথা বলবই, চুপ থাকব না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পনি স্বামীর সিদ্ধান্ত আর অবস্থান মেনে নিতে শিখেছেন। তাঁর চোখে প্রকাশ রাজ নির্ভীক একজন মানুষ, যে বিশ্বাস থেকে সহজে সরে আসে না। তেলুগু ছবির জগতে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন তিনি, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করেননি। পনি বলেছেন, কোনো কিছুতে বিশ্বাস করলে তা তিনি শতভাগ নিষ্ঠা দিয়ে করেন।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেকের সঙ্গেই তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু পনির দাবি, দেশে বিদেশে সাধারণ মানুষ তাঁর সাহসী, স্পষ্টবাদী মনোভাবের জন্য তাঁকে প্রশংসা করেছেন, ভালোবেসেছেন। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে যে মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে, দর্শকের ভালোবাসা তার বিপরীত ছবিটা দেখায়।
প্রকাশ রাজ নিজেও কখনো নিজের অবস্থান থেকে সরার কথা বলেননি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তিনি সবসময় মূল্য দিয়েছেন। স্ত্রীর সাক্ষাৎকারটা তাই শুধু একটা পরিবারের গল্প নয়, একজন অভিনেতার আদর্শ আর তার মূল্যের গল্প। অগ্রিম নিয়েও প্রযোজকদের সরে যাওয়া, ছবি আর বিজ্ঞাপনের সুযোগ হারানো, তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে বারবার নিষেধাজ্ঞা, সবকিছুর পরেও তিনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। আর এই অনড় অবস্থানই তাঁকে দর্শকের কাছে আলাদা জায়গা দিয়েছে।
