বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে যে কটি ধারাবাহিকের নাম আজও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে, তার মধ্যে সবার ওপরে থাকবে মা। স্টার জলসার এই ধারাবাহিকটি এখন আবার পর্দায় ফিরেছে। ২৫ অক্টোবর থেকে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত স্টার জলসায় পুনঃপ্রচার হচ্ছে মা, আর এই খবরেই পুরোনো দর্শকের মনে ফিরে এসেছে ঝিলিকের শৈশব, প্রতিমার কান্না আর মা মেয়ের মিলনের সেই দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। যাঁরা তখন দেখেননি, তাঁদের জন্য এটি একেবারে নতুন একটি ধারাবাহিক আবিষ্কারের সুযোগ, আর যাঁরা দেখেছিলেন, তাঁদের জন্য নস্টালজিয়ায় ডুবে যাওয়ার আমন্ত্রণ। এই গাইডে রইল ধারাবাহিকটির সম্পূর্ণ পরিচয়, গল্প, কাস্ট, নির্মাণের তথ্য, কেন এটি এত বড় হয়ে উঠেছিল, পুরস্কার ও অন্য ভাষায় রিমেকের খবর, আর সবচেয়ে জরুরি কথা, কখন কোথায় দেখবেন।
এক নজরে ধারাবাহিকটির পরিচয় জেনে নেওয়া যাক। পুরো নাম মা, তোমায় ছাড়া ঘুম আসেনা। চ্যানেল স্টার জলসা। প্রথম সম্প্রচার ১৯ অক্টোবর ২০০৯, শেষ সম্প্রচার ৩ আগস্ট ২০১৪। মোট পর্ব ১৫০৮টি। প্রতি পর্বের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২১ মিনিট। প্রযোজনা সংস্থা শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস, প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা ও মহেন্দ্র সোনি। পরিচালনা করেছেন সুশান্ত দাস ও দেবীদাস ভট্টাচার্য। গল্প লিখেছেন শাহানা দত্ত, সংলাপ প্রীতিকণা পল রায়ের, চিত্রনাট্য সুদীপ ও সৌম্যভর। ধারাবাহিকের শিরোনাম গান তোমায় ছাড়া ঘুম আসেনা, সুরকার জিৎ গাঙ্গুলী। এই তথ্যগুলো একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, মা কোনো হঠাৎ জনপ্রিয় হওয়া ধারাবাহিক ছিল না, এটি ছিল প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা একটি সুপরিকল্পিত দীর্ঘ যাত্রা।
গল্পের শুরুটা এমন এক ঘটনা দিয়ে, যা দর্শককে প্রথম পর্ব থেকেই বেঁধে ফেলে। পরী মুখোপাধ্যায়ের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। সেই ছোট্ট মেয়েটিকে অপহরণ করা হয়, আর তার মা প্রতিমা মুখোপাধ্যায় চিরদিনের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তাঁর মেয়ের কাছ থেকে। এরপর বছরের পর বছর ধরে পরী বড় হয় অপহরণকারীর কাছে, চোরের জীবন নিয়ে, ঝিলিক নামে। মা ও মেয়ের এই বিচ্ছেদই ধারাবাহিকের মূল সুর, আর সেই সুরের ওপরই গড়ে ওঠে পরের প্রায় দেড় হাজার পর্বের গল্প। গল্পের কেন্দ্রে আছে একটাই প্রশ্ন, মা কি কোনোদিন তাঁর হারানো মেয়েকে ফিরে পাবেন, আর মেয়ে কি জানতে পারবে সে আসলে কে।
ঝিলিকের জীবনটাই ধারাবাহিকের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ। যে শিশুটি জন্মেছিল এক স্নেহময় পরিবারে, সে বড় হয় চুরি করে বেঁচে থাকার জগতে। ঝিলিক নামে পরিচিত এই মেয়েটি জানে না তার আসল পরিচয়, জানে না তার মা আজও তার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। অথচ তার ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করে, একটা অজানা টান কাজ করে, যা তাকে বারবার সেই সত্যের দিকে ঠেলে দেয়। এই দ্বন্দ্বই ঝিলিকের চরিত্রকে শুধু একটি ধারাবাহিকের নায়িকা করে রাখেনি, তাকে বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করেছে। শিশু ঝিলিকের চরিত্রে অভিনয় করা তিথি বসুর নাম আজও এই চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বহু বছর পর ঝিলিক ও প্রতিমার দেখা হয়, কিন্তু সেই দেখা সুখের হয় না। ভুল বোঝাবুঝির কারণে মা ও মেয়ে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই দ্বিতীয় বিচ্ছেদ গল্পে নতুন মোড় আনে। এরপর ঝিলিককে দত্তক নেন প্রতিমা রায় চৌধুরী, একজন অন্ধ ধনকুবের। তাঁর আশ্রয়ে ঝিলিক নতুন জীবন পায়, নতুন পরিচয় পায়, আর ধীরে ধীরে মা ও মেয়ের মধ্যে পরিচয়ের সুতোটি আবার জোড়া লাগতে শুরু করে। কিন্তু গল্প এখানেই থেমে থাকে না। পরে এক চমকপ্রদ সত্য প্রকাশ পায়, প্রতিমা রায় চৌধুরীই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরীকে অপহরণ করেছিলেন, আর ঝিলিকের জায়গায় তিনি দিয়া রায় চ্যাটার্জিকে বদলে দিয়েছিলেন। এই রেটকন বা গল্পের পেছনের সত্য উন্মোচনের মোড়টি ধারাবাহিকের শেষ দিকের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
ঝিলিক বা পরীর চরিত্রে তিনজন অভিনেত্রীকে দেখা গেছে, আর এই বদলটাই গল্পের সময়ের প্রবাহকে ধরে রেখেছে। শিশু ঝিলিক ও পরীর চরিত্রে ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত অভিনয় করেন তিথি বসু, যিনি পরে ২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আবার ফিরে আসেন এই চরিত্রে। ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিক বা পরীর চরিত্রে ছিলেন শ্রীতমা ভট্টাচার্য, আর তিনিই ২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দিয়া রায়ের চরিত্রেও অভিনয় করেন। শিশু পরীর চরিত্রে ছিলেন সোহেনা রায়। এই তিন প্রজন্মের অভিনয় মিলিয়ে ঝিলিকের চরিত্রটি শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত দর্শকের চোখের সামনে বড় হয়েছে, আর সেটাই এই চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের এত গভীর বন্ধনের অন্যতম কারণ।
প্রতিমা মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মহুয়া হালদার। তিনি পরীর মা, মণীশের স্ত্রী। প্রতিমার চরিত্রটি ধারাবাহিকের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু, হারানো মেয়ের জন্য তাঁর অপেক্ষা, তাঁর কান্না আর তাঁর আশা, এই তিনটি জিনিসই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মণীশ মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে ছিলেন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, পরীর বাবা। পরিবারের প্রবীণদের মধ্যে ছিলেন ছন্দা করঞ্জি, মমতা মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে, পরীর ঠাকুমা, আর চণ্ডীচরণ, হরিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে, পরীর ঠাকুরদা। এই পরিবারটির ভেতরের সম্পর্ক, স্নেহ, ভুল বোঝাবুঝি আর মিলন, সব মিলিয়ে মা একটি পারিবারিক ধারাবাহিকের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছিল।
পার্শ্বচরিত্রগুলোও ধারাবাহিকটিকে সমৃদ্ধ করেছে। অপরাজিতা আঢ্য অভিনয় করেছেন প্রতিমা রায় চৌধুরীর চরিত্রে, সেই অন্ধ ধনকুবের, যাঁর দত্তক গ্রহণ আর লুকোনো অতীত গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ছিলেন রাজদীপ রায়, দিয়ার স্বামী। রাজীব বসু অভিনয় করেছেন অরুণাংশু মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে, ঝিলিক ও দিয়ার প্রাক্তন প্রেমিক। প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য ছিলেন বাবলি, প্রতিমা রায় চৌধুরীর মেয়ে। সোমা চক্রবর্তী ছিলেন হিরা আম্মা, আর তাঁর অভিনয় পুরস্কারও পেয়েছে। এছাড়া ছিলেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, অনিন্দিতা সাহা কপিলেশ্বরী, ঋতা দত্ত চক্রবর্তী, অরিত্র দত্ত, দোলন রায়, সৌরভ দাস, এনা সাহা, চন্দ্রনীভ মুখোপাধ্যায়, সুজাতা দাঁ, সোনালী চৌধুরী, অশ্মিতা চক্রবর্তী ফুলকির চরিত্রে, অরিত্রম মুখোপাধ্যায় আদিত্য রায়চৌধুরীর চরিত্রে, রোহিত মুখোপাধ্যায়, ঋতোজা মজুমদার, অমিতাভ ভট্টাচার্য, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, শঙ্কর চক্রবর্তী, ভাবনা ব্যানার্জি। এই বড় পরিবারটিই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে নতুন নতুন গল্পের জন্ম দিয়েছে।
নির্মাণের দিক থেকেও মা ছিল তার সময়ের অন্যতম বড় প্রযোজনা। শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ব্যানারে তৈরি এই ধারাবাহিকের শুটিং হয়েছে কলকাতায়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন পর্ব তৈরি করা, দেড় হাজারের বেশি পর্ব ধরে গল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা, চরিত্রের বদল সামলানো, এই সবই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ধারাবাহিকটির শিরোনাম গান তোমায় ছাড়া ঘুম আসেনা, জিৎ গাঙ্গুলীর সুরে, আজও অনেক দর্শকের মনে গেঁথে আছে। গানটি শুধু একটি শিরোনাম গান ছিল না, এটি ছিল মা ও মেয়ের বিচ্ছেদের গল্পের সংগীতময় প্রকাশ।
মা কেন এত বড় হয়ে উঠেছিল, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এর রেকর্ডে। এটি বাংলা টেলিভিশনের দীর্ঘতম ধারাবাহিকগুলোর একটি, আর স্টার জলসার সবচেয়ে বেশি দিন চলা ধারাবাহিক। তিন বছর ধরে এটি ছিল স্টার জলসার সর্বোচ্চ রেটিং পাওয়া শো। অর্থাৎ, প্রায় পাঁচ বছরের যাত্রার বেশিরভাগ সময় জুড়ে এই ধারাবাহিকটি ছিল চ্যানেলের এক নম্বর অনুষ্ঠান। ৩ আগস্ট ২০১৪-তে ধারাবাহিকটি শেষ হয় একটি বিশেষ ধামাকা পর্ব দিয়ে, যেখানে অন্যান্য ধারাবাহিকের তারকারাও ছিলেন, আর ছিলেন কোয়েল মল্লিক ও রাজ চক্রবর্তীর মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা। এই শেষ পর্বটিই বলে দেয়, মা শুধু একটি ধারাবাহিক ছিল না, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা।
পুরস্কারের তালিকাতেও মায়ের নাম উজ্জ্বল। ধারাবাহিকটি টেলি সিনে অ্যাওয়ার্ড, স্টার জলসা অ্যাওয়ার্ড ও টেলি সম্মান অ্যাওয়ার্ডে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে। ১৩তম টেলি সিনে অ্যাওয়ার্ডে শ্রীতমা ভট্টাচার্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান, আর সোমা চক্রবর্তী পান সেরা পারফরম্যান্সের পুরস্কার। এই পুরস্কারগুলো শুধু অভিনয়ের স্বীকৃতি নয়, এগুলো প্রমাণ করে যে ধারাবাহিকটি দর্শকের পাশাপাশি সমালোচকদের কাছেও সমাদৃত হয়েছিল।
মায়ের গল্প এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি একাধিক ভাষায় রিমেক হয়েছে। হিন্দিতে মেরি মা নামে লাইফ ওকে চ্যানেলে চলেছে ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। মালয়ালমে আম্মা নামে এশিয়ানেটে চলেছে ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। তামিলে বোম্মুকুট্টি আম্মাভুক্কু নামে স্টার বিজয়ে চলেছে ২০২০ সালে। তেলুগুতে পাপে মা জীবনজ্যোতি নামে স্টার মায়ে চলছে ২০২১ সাল থেকে। আর হিন্দিতে চিকু, ইয়ে ইশক নাচায়ে নামে স্টার প্লাসে চলেছে ২০২১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত। একটি বাংলা ধারাবাহিকের গল্প পাঁচটি ভিন্ন ভাষায়, পাঁচটি ভিন্ন দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়া, এটাই মায়ের গল্পের সার্বজনীন আবেদনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মা ও মেয়ের বিচ্ছেদ ও মিলনের গল্প ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
এবার আসা যাক সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নে, পুনঃপ্রচার কখন দেখবেন। স্টার জলসার অফিসিয়াল প্রোমো অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর থেকে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মা দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ, দুপুরের আড়াই ঘণ্টার ব্লকে একসঙ্গে একাধিক পুরোনো পর্ব দেখানো হচ্ছে, যা পুনঃপ্রচারের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম। আজ ৬ নভেম্বরের টেলিভিশন তালিকাতেও দুপুর ৩টার স্লটে মা রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী ভোররাত ৩টা ৩০ মিনিটেও ধারাবাহিকটির পুনঃপ্রচার রয়েছে। তবে সময়সূচি চ্যানেলের প্রয়োজনে বদলাতে পারে, তাই টিভি দেখার আগে সেদিনের তালিকা একবার মিলিয়ে নেওয়াই ভালো।
টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইনেও মা দেখা যায়। স্ট্রিমিং তথ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিকটির স্ট্রিমিং স্বত্ব রয়েছে জিওহটস্টারের কাছে। স্টার জলসার ধারাবাহিকগুলো সাধারণত জিওহটস্টারে দেখা যায়, আর মায়ের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য। এয়ারটেল এক্সস্ট্রিম প্লের মাধ্যমেও জিওহটস্টারের ভেতর দিয়ে ধারাবাহিকটি দেখা যায়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্ল্যান ও সাবস্ক্রিপশনের শর্ত প্রযোজ্য হবে। যাঁরা টিভিতে দুপুরের স্লটটি মিস করেন, তাঁরা অনলাইনে নিজের সময়মতো পর্বগুলো দেখে নিতে পারেন। তবে কোনো পর্ব জিওহটস্টারে কতদিন থাকবে, তা প্ল্যাটফর্মের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তাই দেখতে চাইলে দেরি না করাই ভালো।
যাঁরা আগে কখনো মা দেখেননি, তাঁদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ রইল। প্রথমত, ধারাবাহিকটি ১৫০৮ পর্বের, তাই প্রথম পর্ব থেকে শুরু করে সব পর্ব দেখার চেষ্টা না করে, পুনঃপ্রচারের ধারাবাহিকতাতেই গল্পের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া ভালো। দ্বিতীয়ত, গল্পের মূল সুতোটি মনে রাখুন, মা ও মেয়ের বিচ্ছেদ, ঝিলিকের পরিচয়ের খোঁজ, আর প্রতিমা রায় চৌধুরীর রহস্য। এই তিনটি সুতো ধরে রাখলে গল্পের কোনো মোড়ই অচেনা লাগবে না। তৃতীয়ত, ঝিলিকের চরিত্রে অভিনেত্রী বদলের বিষয়টি মাথায় রাখুন, শিশু ঝিলিক, প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিক আর দিয়ার গল্পে একই অভিনেত্রীর দুটি চরিত্র, এই বিষয়গুলো গল্পের জটিলতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
আর যাঁরা একসময় মা দেখেছিলেন, তাঁদের জন্য এই পুনঃপ্রচার একটি ফিরে যাওয়ার সুযোগ। ২০০৯ থেকে ২০১৪, এই পাঁচ বছরে বাংলা টেলিভিশন অনেক বদলেছে, কিন্তু ঝিলিকের গল্পের আবেগ আজও একই রকম তাজা। দুপুরের অবসরে পরিবারের সঙ্গে বসে পুরোনো পর্ব দেখা, শিরোনাম গানটি আবার শোনা, আর সেই সময়ের স্মৃতি ফিরে পাওয়া, এই পুনঃপ্রচারের আসল আনন্দ এখানেই। অনেক দর্শকের কাছে মা শুধু একটি ধারাবাহিক নয়, এটি তাঁদের নিজেদের জীবনের একটি সময়ের স্মৃতি।
সবশেষে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর এক জায়গায় দেওয়া যাক। মা ধারাবাহিকটি কবে শুরু হয়েছিল, ১৯ অক্টোবর ২০০৯। কবে শেষ হয়েছিল, ৩ আগস্ট ২০১৪। মোট কত পর্ব, ১৫০৮টি। ঝিলিক আসলে কে, সে-ই হারিয়ে যাওয়া পরী মুখোপাধ্যায়, যাকে তিন বছর বয়সে অপহরণ করা হয়েছিল। প্রতিমা মুখোপাধ্যায় কে, পরীর মা, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মহুয়া হালদার। পুনঃপ্রচার কখন দেখা যাবে, প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে ৫টা, স্টার জলসায়। অনলাইনে কোথায় দেখা যাবে, জিওহটস্টারে। এটি কি নতুন পর্ব, না, এটি ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত চলা ধারাবাহিকটির পুনঃপ্রচার। এই উত্তরগুলো মনে রাখলে মা দেখার অভিজ্ঞতা আরও সম্পূর্ণ হবে।
ঝিলিকের চরিত্রটি শুধু গল্পের চরিত্রই নয়, এটি অভিনেত্রীদের জীবনের মোড় ঘোরানো চরিত্রও। শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু করা তিথি বসু এই ধারাবাহিকে ঝিলিকের চরিত্রে অভিনয় করেই দর্শকের কাছে পরিচিতি পান, আর ঝিলিক নামটি তাঁর নামের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে আজও এই চরিত্রের প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর নাম আসে। শ্রীতমা ভট্টাচার্যও প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিকের চরিত্রে অভিনয় করে ঘরে ঘরে পরিচিত হন। প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য বাবলির চরিত্রে অভিনয়ের পর জনপ্রিয়তা পান। অর্থাৎ, মা শুধু দর্শককে গল্প উপহার দেয়নি, এটি একাধিক অভিনেত্রীকে তাঁদের ক্যারিয়ারের পরিচয়ও দিয়েছে। এই কারণেই ধারাবাহিকটির পুনঃপ্রচার শুধু পুরোনো গল্প দেখা নয়, সেই সময়ের প্রিয় মুখগুলোকে আবার দেখার সুযোগও।
ধারাবাহিকটির শেষটাও ছিল ঠিক ততটাই জাঁকজমকপূর্ণ, যতটা ছিল এর যাত্রা। ৩ আগস্ট ২০১৪-তে মা শেষ হয় একটি বিশেষ ধামাকা পর্ব দিয়ে। সেই বিশেষ পর্বে শুধু মায়ের চরিত্ররাই ছিলেন না, ছিলেন অন্যান্য ধারাবাহিকের তারকারাও, আর ছিলেন কোয়েল মল্লিক ও রাজ চক্রবর্তীর মতো চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বরা। শেষ পর্বের পর একটি র্যাপ আপ পার্টিরও আয়োজন হয়েছিল, যেখানে রাজ ও কোয়েলের উপস্থিতির খবর সে সময় সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। একটি ধারাবাহিকের শেষ পর্বকে এভাবে উদযাপন করা, এটাই বলে দেয় মা সে সময় বাংলা টেলিভিশনে কতটা বড় জায়গা জুড়ে ছিল। প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন দর্শকের ঘরে পৌঁছে যাওয়া একটি গল্পের বিদায়কে সেভাবেই বিদায় জানানো হয়েছিল, যেভাবে একটি বড় ঘটনাকে বিদায় জানানো হয়।
ধারাবাহিকটির নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর পুরো আবেগ। মা, তোমায় ছাড়া ঘুম আসেনা, অর্থাৎ মাকে ছাড়া ঘুম আসে না। এই একটি লাইনই বলে দেয় গল্পটি কী নিয়ে, মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি শিশুর দীর্ঘ অপেক্ষা, আর মায়ের হারানো মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। স্টার জলসা অক্টোবরে প্রোমো প্রকাশ করে ২৫ অক্টোবর থেকে পুনঃপ্রচার শুরুর ঘোষণা দেয়, আর বিনোদন ঝলকে ১৮ অক্টোবর ফেরার খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল। পুনঃপ্রচারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দর্শকের নস্টালজিয়া, কারণ এই ধারাবাহিকটি দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম এখন নিজেরাই অভিভাবক, আর তাঁদের অনেকেই চান তাঁদের সন্তানরা এই গল্পটি দেখুক। দুপুরের আড়াই ঘণ্টার ব্লকে পুরোনো পর্বগুলো দেখানো হচ্ছে বলে একদিনে গল্প অনেকটা এগিয়ে যায়, ফলে নতুন দর্শকও দ্রুত গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
মা ফিরে আসায় বাংলা টেলিভিশনের একটি সোনালি অধ্যায় আবার খুলে গেল। যে ধারাবাহিকটি একসময় তিন বছর ধরে চ্যানেলের শীর্ষে ছিল, যে গল্প পাঁচটি ভাষায় ছড়িয়ে পড়েছিল, আর যে চরিত্রগুলো আজও দর্শকের মনে বেঁচে আছে, সেই গল্পটি এখন নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে। দুপুর ৩টায় টিভি খুলে বসুন, কিংবা জিওহটস্টারে নিজের সময়মতো দেখুন, মা ও মেয়ের এই গল্পটি আজও ঠিক ততটাই হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, যতটা ছুঁয়েছিল প্রথমবার।
