আজকের বাংলা নাটকের ইউটিউব-জগতে নতুন এক জুটির নাম উঠে আসছে বারবার: খায়রুল বাসার ও সাদনিমা বিনতে নোমান। পরপর দুটি নাটক তাঁদের কোটি ভিউ ছাড়িয়ে গেছে, আর দর্শকের এমন সাড়া পেয়ে তাঁরা নিজেরাও বিস্মিত। কীভাবে এল এই সাফল্য, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁরা নিজে এবং দুটি নাটকের পরিচালক সেরনিয়াবাত শাওন।
জুটির যাত্রা শুরু এক বছর আগে, ‘গোল্ডফিশ’ নাটকের মধ্য দিয়ে। একটা দৃশ্যের কথা দর্শক আজও মনে রেখেছেন। রাগ করে প্রেমিকা চলে যাচ্ছে, তাকে আটকাতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পায় অয়ন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেই পা নিয়েই রাস্তায় নেমে প্রেমিকাকে সম্পর্ক না ভাঙার অনুরোধ জানায় সে। জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে মজা পায় ফারিয়া, আর ফারিয়ার ভূমিকায় সাদনিমা বিনতে নোমানের সেই প্রথম হাসিতেই মুগ্ধ হয়ে যান ভক্তরা। পরে ফারিয়ার সঙ্গেই প্রেম হয় অয়নের।
‘গোল্ডফিশ’-এর সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি একবার মনে করা যাক। অয়ন চরিত্রে খায়রুল বাসার: পা ব্যথা নিয়েও রাস্তায় দাঁড়িয়ে বারবার অনুরোধ করছেন প্রেমিকাকে, সম্পর্কটা যেন না ভাঙে। আর জানালার ফ্রেমে ফারিয়া, যার চরিত্রে সাদনিমা বিনতে নোমান: প্রথমে মজা পাচ্ছে, তারপর সেই মুগ্ধ হাসি। এই হাসিটাই দর্শকের মনে গেঁথে যায়। পরে গল্পে এই ফারিয়ার সঙ্গেই প্রেম হয় অয়নের, আর পর্দার বাইরে এই দৃশ্যই জন্ম দেয় নতুন এক জুটির।
এরপর ‘বই পোকা’, ‘ভটভটি’, ‘মনডুবি’ নাটকে একসঙ্গে দেখা যায় এই জুটিকে। তবে জুটি হিসেবে সত্যিকারের আলোচনায় আসেন তাঁরা ‘কাছের কেউ’ দিয়ে। সেরনিয়াবাত শাওনের পরিচালনায় তৈরি এই নাটকটিই তাঁদের জুটির প্রথম কোটি ভিউয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে।
‘কাছের কেউ’ ছিল সেই জায়গা, যেখানে প্রথমবারের মতো এই দুজনকে দেখে দর্শক তাঁদের জুটি বলে চিনতে শুরু করেন। আগে ‘বই পোকা’, ‘ভটভটি’, ‘মনডুবি’তে একসঙ্গে কাজ করলেও জুটি-স্বীকৃতি মেলেনি। সেরনিয়াবাত শাওনের পরিচালনায় ‘কাছের কেউ’ কোটি ভিউ ছাড়ানোর পর সেই ছবি বদলে যায়। শাওনের দুটি নাটকেই এই জুটির রসায়ন প্রমাণিত, আর এই দুটি কাজের মাধ্যমেই তাঁরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় এ মাসে মুক্তি পায় একই পরিচালকের ‘তোমার ঠিকানায়’। মুক্তির মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে নাটকটি কোটি ভিউ ছাড়িয়ে যায়। পরপর দুটি কাজে এমন সাড়া পেয়ে অবাক নিজে খায়রুল বাসারও।
জুটির সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে হাসিমুখে বাসার জানান, পরপর দুটি কাজ দর্শক এতটা পছন্দ করবে, এটা তিনি ভাবেননি। তাঁর মতে রহস্য আর কিছুই নয়, গল্প। দর্শক ঠিকঠাক একটি গল্প দেখতে চায়, আর এই দুটি নাটকের গল্প ও সংলাপ অনেক ভালো ছিল। তাঁরা সেটা যথাযথভাবে পর্দায় তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
বাসারের ব্যাখ্যায়, যখন দুজন শিল্পী নিজ নিজ জায়গায় ঠিকঠাক বসে যান, সংলাপ ও পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং দুজনেই সেটা পর্দায় পৌঁছে দিতে পারেন, তখন একটি কাজ ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে যায়। তাঁদের চেষ্টাটা সেটাই ছিল।
নিজের কাজগুলো তিনি শুধু অভিনয়শিল্পীর চোখে নয়, দর্শকের আসনে বসেও পর্যবেক্ষণ করেন। কোনো গল্প হাতে পেলেই অনেক সময় নিজেকে দর্শকের জায়গায় কল্পনা করেন এই অভিনেতা। তাঁর ভাষায়, দর্শক হিসেবেও তিনি গল্পগুলোর যাত্রার সঙ্গে ছিলেন, গল্পের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন তাঁরা।
সাড়ার প্রভাব পড়ছে তাঁদের কাজের জীবনেও। বাসার জানান, বেশিরভাগ পরিচালকই এখন ফোন করে তাঁদের জুটিকে নিয়ে কাজ করতে চাইছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু নাটকের শিডিউলও দিয়েছেন তাঁরা। দর্শক, পরিচালক ও প্রযোজকদের আগ্রহ যে তাঁদের ঘিরে বেড়েই চলেছে, সেটা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছেন তিনি।
তবে সাফল্যের এই ধারায় ভেসে যাচ্ছেন না সাদনিমা বিনতে নোমান। জুটি হিসেবে একের পর এক কাজের প্রস্তাব এলেও বাছবিচার করেই এগোতে চান তিনি। তাঁর ভাষায়, জুটি হিসেবে আরও কাজ করার পরিকল্পনা তো আছেই, তবে গতানুগতিক কাজ নয়, ভালো গল্প নিয়েই দর্শকের সামনে আসতে চান। বাইরে বের হলে বোঝা যায়, তাঁদের নাটক নিয়ে দর্শকদের কতটা প্রত্যাশা।
দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সাদনিমা বলেন, দর্শক তাঁদের কাজগুলো দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন, সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়। তাঁদের ভালোবাসাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
দুটি সফল নাটকের পরিচালক সেরনিয়াবাত শাওন জানান, এতদিন তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত তারকাদের নিয়েই শুটিং করেছেন। ছয় মাস আগে হঠাৎ করেই বাসারের বিপরীতে সাদনিমাকে কাস্ট করেন তিনি। নতুন জুটি নিয়ে শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ছিলেন পরিচালক। তবে বাসারের সঙ্গে সাদনিমার প্রথম দৃশ্যের শুটিং করেই তাঁর মনে হয়, এই মেয়েটি ভালো অভিনেত্রী হবে।
শাওনের কাস্টিং-সিদ্ধান্তটাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান, এতদিন শুধু প্রতিষ্ঠিত তারকাদের নিয়েই কাজ করেছেন তিনি। ছয় মাস আগে বাসারের বিপরীতে সাদনিমাকে বেছে নেওয়ার সময় তিনি নিজেই অনিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু প্রথম দৃশ্যের শুটিংয়ের পরেই সব সংশয় কেটে যায়। তাঁর ভাষায়, সাদনিমা দ্রুত চরিত্র ধরে ফেলতে পারেন, চরিত্র নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন, আর কাজে অসাধারণ নিবেদন রাখেন। দুজনের অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে দর্শক সেটা ভালোবেসে ফেলেছে। এই স্বাভাবিকতাই তাঁদের জুটির প্রাণ।
শাওনের পর্যবেক্ষণে, সাদনিমা সহজেই চরিত্র ধরে ফেলতে পারেন, চরিত্র নিয়ে অনেক ভাবেন এবং অনেক বেশি ডেডিকেটেড। দুজনের অভিনয়ই খুব স্বাভাবিক, আর সেটাই দর্শক পছন্দ করেছে। তাঁর মতে, এখন মনে হচ্ছে এই জুটির শিডিউল পাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে, কারণ তাঁদের ঘিরে আগ্রহ এতটাই বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের নাটকের বাজারে জুটি-সাফল্যের সমীকরণ এখন বদলে দিচ্ছে ইউটিউব। টিভি-প্রচারের বাইরে ভিউ-সংখ্যাই নতুন মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। সেই মাপকাঠিতে পরপর দুটি কোটি ভিউ প্রমাণ করে, তরুণ দর্শক নতুন মুখের জুটিকেও বুকে টেনে নিচ্ছে, যদি গল্পের জোর থাকে। খায়রুল-সাদনিমার উত্থান সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
‘কাছের কেউ’ ও ‘তোমার ঠিকানায়’ দুটি নাটকই দেখা যাচ্ছে হিয়া এন্টারটেইনমেন্টের ইউটিউব চ্যানেলে। ‘গোল্ডফিশ’ দিয়ে যাঁরা এই জুটিকে চিনতে চান, সেই পথটাও খোলা আছে।
নতুন শিডিউল দেওয়া নাটকগুলোর ঘোষণা এলে বোঝা যাবে, এই জুটির গল্প-বাছাইয়ের ফিল্টার কতটা কঠোর থাকে। সাদনিমার ভাষায় দর্শকের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি, আর সেই প্রত্যাশা ধরে রাখাই এই জুটির সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
