ইরফান সাজ্জাদ ও তানজিন তিশার নাটক প্রথম দেখার পর পুরো পর্ব দেখা যাচ্ছে জি সিরিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে। নাটকটি পরিচালক চয়নিকা চৌধুরীর পরিচালনায় ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বানানো বিশেষ কাজগুলোর একটি, জি সিরিজের ভিডিও বর্ণনায় সেটা স্পষ্ট করে লেখা আছে। তাই যারা টেলিভিশনে নাটকটি দেখতে পারেননি, তারা এখন ইউটিউবেই পুরো নাটকটি দেখে নিতে পারবেন, বৈধ উপায়ে, অফিশিয়াল চ্যানেল থেকে।
নাটকটি লিখেছেন আহমেদ টাওকির। পরিচালনা ও চিত্রনাট্য দুটোই চয়নিকা চৌধুরীর। প্রযোজক নাজমুল হক ভূঁইয়া, লেবেল জি সিরিজ। চিত্রগ্রাহক সুমন হোসেন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তানজিল হাসান, পোস্টার ডিজাইন মাসুম বিল্লাহ। অর্থাৎ, টেলিভিশন নাটকের চেনা কাঠামোতেই তৈরি হয়েছে কাজটি, কিন্তু এর পেছনের উপলক্ষটা আলাদা: একজন পরিচালকের পঁচিশ বছরের পথচলার উদযাপন।
অভিনয়ে প্রধান দুই মুখ ইরফান সাজ্জাদ ও তানজিন তিশা। সঙ্গে আছেন দুই প্রবীণ ও ভরসাযোগ্য নাম, আবুল হায়াত ও ডলি জহুর। আরও অভিনয় করেছেন রিয়া চৌধুরী, রাহুল দেব রাজ ও ফারনাজ মেহরিন। এই কাস্টিংটাই নাটকটির একটা বড় আকর্ষণ, কারণ একদিকে তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় জুটি, অন্যদিকে অভিজ্ঞ শিল্পীদের উপস্থিতি, যা চয়নিকার নাটকের চেনা ছবি।
নাটকের গানটিও আলাদা করে নজর কাড়ার মতো। আকাশ দেখে শিরোনামের গানটি গেয়েছেন সামিনা চৌধুরী ও বাপ্পা মজুমদার। কথা লিখেছেন জুলফিকার রাসেল, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন বাপ্পা মজুমদার। চয়নিকার নাটকে গান বরাবরই গল্পের আবেগকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করে, আর এখানে দুই প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠের যুগলবন্দি সেই ধারাটাই ধরে রেখেছে।
প্রথম দেখার পর-কে বুঝতে হলে চয়নিকা চৌধুরীর পঁচিশ বছরের গল্পটা জানা জরুরি। ২০০১ সালে তিনি পরিচালনায় আসেন প্রায় আকস্মিকভাবে। প্রোডাকশন হাউস লাইট অ্যান্ড শ্যাডোতে আরেকটি কাজের পারিশ্রমিক নিতে গিয়ে নতুন একটি নাটকের আলোচনায় জড়িয়ে পড়েন, আর প্রযোজক মুজিবুর রহমান তাকে জিজ্ঞেস করেন, পরিচালক কে হবেন। চয়নিকা নিজেই জানতে চেয়েছিলেন, আর উত্তর এসেছিল: আপনি। দুই সেকেন্ডের মধ্যে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন তিনি, এই কথাটা তিনি নিজেই ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন।
তার প্রথম শুট করা নাটক ছিল শেষ বেলায়, আর টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম পরিচালিত নাটক এক জীবনে, যা ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর রাত ৮টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। পরিচালনার আগে ১৯৯৮ সালে বোধ নাটক দিয়ে চিত্রনাট্যকার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকে নাচ, গান ও আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর স্বামী অরুণ চৌধুরী তখন পরিচিত পরিচালক। পরিবারের সমর্থন আর নিজের জেদ, এই দুইয়ে ভর করেই ধীরে ধীরে তিনি টেলিভিশন নাটকের পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন।
সংখ্যায় তার কাজের পরিসর চমকে দেওয়ার মতো। ডেইলি স্টারের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, পঁচিশ বছরে তিনি পরিচালনা করেছেন ৪৭৫টি একক নাটক, ১৮টি ধারাবাহিক ও তিনটি সিনেমা। তার কাজে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে আবুল হায়াতকে, প্রায় ২৮০টি সহশিল্পী চরিত্রে। দিলারা জামান অভিনয় করেছেন প্রায় ২৩০ থেকে ২৬০টি নাটকে। পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, ১৬১টি একক নাটক ও চারটি ধারাবাহিকে। নারী শিল্পীদের মধ্যে তারিন জাহান প্রায় ১০০টি নাটকে তার পরিচালনায় কাজ করেছেন।
বড় পর্দাতেও তার যাত্রা উল্লেখযোগ্য। প্রথম সিনেমা বিশ্বসুন্দরী মুক্তি পায় ২০১৯ সালে, যা আটটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। পরে তিনি পরিচালনা করেন প্রহেলিকা। টেলিভিশন থেকে সিনেমা, এই পথে তার গল্প বলার ধরন বদলায়নি, সম্পর্ক, পরিবার আর ভালোবাসাই থেকেছে কেন্দ্রে। তিনি নিজে বলেছেন, সম্পর্ক, পারিবারিক নাটক আর প্রেমের গল্প বানাতেই তিনি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। থ্রিলার ও ওটিটি প্রকল্পেও কাজ করেছেন, কিন্তু প্রেমের আবেগটা তিনি সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
পঁচিশ বছর পরও শুটিংয়ের আগের দিনের নার্ভাসনেস তার কমেনি, এই কথাটা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। প্রথম দিন যেমন ভয় লেগেছিল, আজও শুটিংয়ের আগের দিন সমান নার্ভাস লাগে, শুধু পার্থক্য এটুকুই যে এখন তার কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেটে শৃঙ্খলার ব্যাপারেও তিনি কঠোর, সকাল সাড়ে নয়টায় শুটিং শুরু করে রাত এগারোটার মধ্যে শেষ করার নিয়ম মেনে চলেন, যাতে ইউনিটের সবাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান।
ইউটিউবের যুগে তার নাটকের সাফল্য মাপা যায় ঘণ্টায়। তার সাম্প্রতিক নাটক বিষণ্ণ মেঘ ইউটিউবে আপলোডের চার দিনের মধ্যে ত্রিশ লাখ ভিউ পেয়েছিল। তবে ভিউয়ের ক্ষুধা তার নেই, এই কথাটাও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভালো গল্প, ভালো সেট, সুন্দর চিত্রগ্রহণ ও মানসম্মত অভিনয়। প্রথম দেখার পর-ও সেই মানদণ্ডেই বিচার্য, জুটির রসায়ন আর গল্পের আবেগ দর্শককে টানতে পারে কি না, সেটাই আসল পরীক্ষা।
কোথায় দেখবেন, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ। জি সিরিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রথম দেখার পর লিখে খুঁজলেই পুরো নাটকটি পাওয়া যাচ্ছে। অফিশিয়াল চ্যানেল থেকে দেখার সুবিধা হলো, ছবি ও শব্দের মান ঠিক থাকে, আর শিল্পী ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বীকৃতিও ঠিক জায়গায় পৌঁছায়। অন্য কোনো চ্যানেলে আপলোড করা কপি থেকে দেখার দরকার নেই, কারণ আসল ভিডিওটিই সেখানে আছে।
যারা ইরফান-তিশা জুটির নাটক পছন্দ করেন, তাদের জন্য প্রথম দেখার পর একসঙ্গে দুটো আনন্দ দেবে: একটি রোমান্টিক গল্প, আর তার সঙ্গে একজন পরিচালকের পঁচিশ বছরের সাধনার ছাপ। আর যারা চয়নিকা চৌধুরীর পুরোনো দর্শক, তারা এই নাটকে তার চেনা হাতের ছোঁয়া খুঁজে পাবেন, পরিবার, সম্পর্ক আর ভালোবাসার গল্প, যা তিনি পঁচিশ বছর ধরে বলে আসছেন।
