গতকাল ২৩ অক্টোবর ছিল দেশের নন্দিত উপস্থাপক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেতের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে বরিশালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি চার দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকদের সঙ্গী। সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সেতু জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি', যা আজও বাংলাদেশের টেলিভিশনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর একটি।
জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা-নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু। রাইজিংবিডিতে প্রকাশিত স্মৃতিচারণে লাভলু জানান, "আমি বেশ কিছু দিন ইত্যাদির চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছি। সংকেতদার সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি। এখনো ফোন করলে বলেন, 'লাভলুউ, কী খবর, কেমন আছিস?' আমার খুবই প্রিয় মানুষ। আমাকে খুবই স্নেহ করেন, খুবই ভালোবাসেন।"
সবচেয়ে মজার স্মৃতিটি শিঙাড়া আর কাঁচা মরিচ নিয়ে। লাভলুর বর্ণনায়, একবার তাঁরা লুলু পাগলের মেলা কভার করতে আরিচা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ফেরিতে ওঠার পর হানিফ সংকেত তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, "শিঙাড়া খাবি?" সংকেতদা খুব দ্রুত কথা বলেন। তারপর তিনি ১০-১২টা শিঙাড়া নিয়ে আসেন। এরপর বলেন, "এর সাথে হাফ কেজি কাঁচা মরিচ লাগবে।" লাভলু তো হতবাক: হাফ কেজি কাঁচা মরিচ মানে! পরে সংকেতদার সহকারীকে বলা হলে সে গিয়ে হাফ কেজি কাঁচা মরিচ নিয়ে আসে। লাভলু বলেন, "দেখি, সংকেতদা এক কামড় শিঙাড়া খাচ্ছেন আর সঙ্গে দুই-তিনটা কাঁচা মরিচ খাচ্ছেন। এত কাঁচা মরিচ খেতে পারেন, ও মাই গড! মজার ব্যাপার হলো, আমরা যেতে যেতে হাফ কেজি কাঁচা মরিচ শেষ, বেশিরভাগ কাঁচা মরিচই সংকেতদা খেলেন। এখনো সংকেতদা এরকম কাঁচা মরিচ খান।"
হানিফ সংকেতের সঙ্গে লাভলুর সম্পর্ক শুধু ক্যামেরার পেছনে সীমাবদ্ধ ছিল না। 'ইত্যাদি'-এর বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ বা সামাজিক সচেতনতামূলক অংশে অতিথি অভিনেতা হিসেবে অংশ নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বেশ কটি নাটকেও অভিনয় করেছেন লাভলু, যার মধ্যে আছে 'ঘরের কথা ঘরেই থাক' ও 'ঠিক ঠিকানা'।
হানিফ সংকেতের টেলিভিশন-জীবনের শুরু ফজলে লোহানীর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'যদি কিছু মনে না করেন'-এর মাধ্যমে। এই বরেণ্য সাংবাদিক ও সঞ্চালকের সান্নিধ্য তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, লেখালেখি, উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের নানা দিক তিনি শিখেছেন তাঁর কাছ থেকে। ১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর মৃত্যুর পর 'ঝলক' নামে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দিয়ে একক উপস্থাপনা শুরু করেন হানিফ সংকেত। এরপর আসে 'কথার কথা'; ১৯৮৭ সালে এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন তিনি। ১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করে 'ইত্যাদি'। এর পরের গল্পটি বাংলাদেশের টেলিভিশন বিনোদনের ইতিহাসেরই অংশ।
'ইত্যাদি'-এর বাইরেও নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন হানিফ সংকেত। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক 'কুসুম', যা পরিচালনা করেন হুমায়ূন আহমেদ। নাটক পরিচালনাও করেছেন তিনি; এ তালিকায় আছে 'আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়', 'দুর্ঘটনা', 'তোষামোদে খোশ আমোদে', 'কিংকর্তব্য', 'শেষে এসে অবশেষে'। শুধু পর্দায় নয়, দুই মলাটেও বন্দি করেছেন হাসি আর ব্যঙ্গ; তাঁর রচিত রম্য রচনার বইগুলোর মধ্যে আছে 'চৌচাপটে', 'এপিঠ ওপিঠ', 'ধন্যবাদ', 'অকাণ্ড কাণ্ড', 'খবরে প্রকাশ', 'প্রতি ও ইতি', 'আটখানার পাটখানা'।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা সম্মাননা পেয়েছেন হানিফ সংকেত। ২০১০ সালে পান একুশে পদক। পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদকও। আর চলতি বছর তাঁর অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬। চার দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি যেমন দর্শককে হাসিয়েছেন, তেমনি সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন। ৬৮-তে পা রাখা এই মানুষটির কাছে বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
