বিনোদন ঝলক
সিনেমা

'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু' কেমন হলো: TOI-র ৩.৫ রেটিং, সমালোচক-দর্শক যা বললেন, আজ ৫ দেশে মুক্তি

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৩ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি
'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'র প্রধান অভিনেতা ও সহ-পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (ছবি: Arghyaks, CC BY-SA 4.0)

পুজোয় মুক্তির এক সপ্তাহের মাথায় সমালোচকদের রায় এসে গেছে। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'কে টাইমস অব ইন্ডিয়া দিয়েছে ৫-এ ৩.৫ রেটিং, আর রিভিউ প্ল্যাটফর্ম টেনভাউ দিয়েছে ১০-এ ৭.৫। দুই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় আর ছবির টানটান ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার গল্প, আর সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে ছবির দৈর্ঘ্য নিয়ে। এর মধ্যেই আজ, ২৩ অক্টোবর, ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে। ফলে দেশের পুজোর বক্স অফিস পেরিয়ে এবার প্রবাসী বাঙালি দর্শকের সামনে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে এই সিক্যুয়েল।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সমালোচক এশনা ভট্টাচার্য গত ১৭ অক্টোবরের রিভিউতে লিখেছেন, "Bohurupi: The Golden Daku combines a lively chase, good humour, strong music and a conscience, anchored by a commanding lead performance." অর্থাৎ প্রাণবন্ত ধাওয়া, ভালো হাস্যরস, শক্তিশালী সংগীত আর বিবেকের মিশেলে তৈরি এই ছবির ভরকেন্দ্র একজন দাপুটে প্রধান অভিনেতা। তাঁর মতে ছবির শেষটা দর্শকের ধৈর্যের পুরস্কার দেয়, তবে মাঝপথের কিছু টানা অংশে ধৈর্যের পরীক্ষাও নিতে হয়। রিভিউতে প্রশংসা পেয়েছে সুগঠিত চিত্রনাট্য, অপ্রত্যাশিত গল্পের বাঁক, শিবপ্রসাদের পর্দা-উপস্থিতি, প্রধান শিল্পীদের অভিনয়, কমিক দৃশ্য, সংগীত, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, সিনেমাটোগ্রাফি, সংলাপ ও প্রোডাকশন ডিজাইন। আর দুর্বল দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সোহিনী সরকারের চরিত্রের দুর্বল লেখনী, প্রয়োজনের বেশি দৈর্ঘ্য, কিছু অযথা টানা দৃশ্য, ঢিলেঢালা এডিটিং এবং গল্পের কয়েকটি ফাঁক।

দ্য টেলিগ্রাফের সমালোচক অগ্নিভ নিয়োগীর পাঠ কিছুটা মিশ্র। তাঁর মতে ছবিটি "an engaging crime thriller that often entertains but rarely moves the audience", অর্থাৎ এমন এক আকর্ষণীয় ক্রাইম থ্রিলার যা প্রায়ই বিনোদন দেয়, কিন্তু দর্শককে খুব একটা নাড়া দেয় না। তিনি ছবির প্রতারণা ও ছদ্মবেশের থিম, অপ্রত্যাশিত টুইস্ট, প্রাণবন্ত চিত্রনাট্য, শিল্পীদের অভিনয় এবং যিশু সেনগুপ্ত ও শিবপ্রসাদের চরিত্র দুটির রসায়নের প্রশংসা করেছেন। তবে তাঁর আপত্তি, চতুর প্লট আর মুখোমুখি সংঘাতের ভিড়ে ছবিটি হারিয়ে ফেলেছে সেই জিনিসটাই যা প্রথম পর্বকে কার্যকর করেছিল: চরিত্র আর দর্শকের মধ্যকার আবেগীয় সংযোগ। পাশাপাশি রাজনৈতিক সাবপ্লটগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

রিভিউ প্ল্যাটফর্ম টেনভাউ ছবিটিকে দিয়েছে ১০-এ ৭.৫ এবং রায় দিয়েছে, এটি এমন এক জমজমাট উৎসবের বিনোদন যা প্রথম ছবির স্কেল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ছাড়িয়ে গেছে, আবার শিকড়-ছোঁয়া ক্রাইম-কেপার ধাঁচটাও ধরে রেখেছে। তাদের মতে ছবির শক্তির জায়গা: শিবপ্রসাদ ও যিশুর শক্তিশালী অভিনয় ও তীক্ষ্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হাইস্ট-থ্রিল, হাস্যরস ও লোকজ উপাদানের প্রাণবন্ত মিশ্রণ, এবং প্রথম পর্বের চেয়ে ভালো চিত্রনাট্যের গতি ও সামাজিক বার্তা। দুর্বল দিক হিসেবে তারা বলেছে, প্রথম ছবির ছাঁচের কিছু পুনরাবৃত্তি আছে এবং দ্বিতীয়ার্ধে মাঝে মাঝে গতির ওঠানামা চোখে পড়ে। সব মিলিয়ে তাদের পরামর্শ: প্রথম পর্বের ভক্ত এবং চালাক বিড়াল-ইঁদুর খেলা পছন্দ করেন যাঁরা, তাঁদের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া উচিত।

বাংলা দৈনিক আজকালের সমালোচক রাহুল মজুমদারের এক লাইনের রায় ছিল চমকপ্রদ: এটি এমন এক সফল সিক্যুয়েল যা ঠিক আর ভুলের মধ্যকার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়। অর্থাৎ নায়ক-খলনায়কের চেনা বিভাজন এখানে কাজ করে না, দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে কে আসলে ঠিক, কে ভুল।

গল্পের কেন্দ্রে বিক্রম প্রামাণিক, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চরিত্র। ১৯৯০-এর দশকের গ্রামীণ বাংলার সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত এই গল্পে বিক্রম একজন ধূর্ত পলাতক, যে বারবার নিজের পরিচয় বদলে পুলিশকে ফাঁকি দেয়। প্রতিটি নতুন ছদ্মবেশের সঙ্গে পুলিশ আর পলাতকের ধাওয়া নেয় নতুন মোড়। তার পেছনে লেগে থাকা অফিসার অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকায় যিশু সেনগুপ্ত। আরও আছেন কৌশানী মুখোপাধ্যায় ও সোহিনী সরকার। ছবির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট, সেন্সর রেটিং UA16+। সংগীত করেছেন বনি চক্রবর্তী, অনুপম রায়, অর্ণব দত্ত, ননি ছোড়া দাস বাউলসহ আরও অনেকে। প্রযোজনায় উইন্ডোজ প্রোডাকশন।

মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম 'বহুরূপী' ছিল ওই বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী বাংলা ছবিগুলোর একটি। নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ জুটি এর আগে 'ইচ্ছে', 'বেলাশেষে', 'প্রাক্তন', 'পোস্ত', 'হামি'র মতো একের পর এক সফল ছবি দিয়েছেন, যেগুলো সমালোচকদের প্রশংসা আর বক্স অফিস, দুটোই পেয়েছে। ফলে সিক্যুয়েলের ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল আকাশছোঁয়া। সেই চাপের মুখে ৩.৫ রেটিংকে খারাপ বলা যায় না, বিশেষ করে যখন প্রায় সব সমালোচকই একমত যে শিবপ্রসাদের অভিনয় ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ।

এবার আন্তর্জাতিক মুক্তির খবর। 'কেজিএফ' ও 'কান্তারা'র মতো ছবি বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া প্রত্যঙ্গিরা সিনেমাস এবার 'বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু'র বিদেশ-পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়েছে। আজ ২৩ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখা যাবে। এর আগেই 'কেজিএফ'-খ্যাত হোমবেল ফিল্মস ছবিটির আন্তর্জাতিক মুক্তির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। লক্ষ্য স্পষ্ট: প্রবাসী বাঙালি দর্শকের মন জয় করা, আর বাংলা ছবির বিশ্ববাজারকে আরও বড় করা।

দেশের বক্স অফিসে অবশ্য লড়াইটা কঠিন। পুজোর মৌসুমে 'দ্য একেন'-এর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রথম দিনে 'বহুরূপী ২' পিছিয়ে ছিল: 'দ্য একেন' প্রথম দিনে ৭৭ লাখ রুপি নিট আয় করে ২০২৬-এর সেরা বাংলা ওপেনিংয়ের রেকর্ড গড়েছিল, আর 'বহুরূপী ২'-এর প্রথম দিনের নিট আয় ছিল ৪৭ লাখ রুপি। এই শো-যুদ্ধের বিস্তারিত আমাদের পুজোর বক্স অফিস প্রতিবেদনে পড়তে পারবেন। তবে উৎসবের ছবির আসল পরীক্ষা হয় সপ্তাহান্তে ও দ্বিতীয় সপ্তাহে, মুখে মুখে প্রচারের জোরে। টেনভাউয়ের মতো প্ল্যাটফর্ম যখন বলে প্রথম পর্বের ভক্তদের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া উচিত, তখন বোঝা যায় সিক্যুয়েলের ভাগ্য এখন দর্শকের হাতে। সমালোচকদের মিশ্র-ইতিবাচক রায় আর প্রাথমিক সাড়া মিলিয়ে ছবিটির সামনে এখনো লম্বা দৌড় বাকি।

কোথায় দেখবেন, এই প্রশ্নের উত্তর এখন সহজ। ভারতে ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে চলছে, আর আজ থেকে পাঁচ দেশের প্রবাসী দর্শকও হলে দেখতে পারবেন। ওটিটি মুক্তির তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি, ফলে বড় পর্দাই আপাতত একমাত্র ঠিকানা। যাঁরা প্রথম পর্ব দেখে বিক্রমের ছদ্মবেশের খেলা ভালোবেসেছিলেন, তাঁদের জন্য এই সিক্যুয়েল প্রেক্ষাগৃহের টিকিটের দাবি রাখে, অন্তত সমালোচকদের রায় তেমনই বলছে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার