সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় এবার সামনে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা। গতকাল শনিবার ভোরের দিকে রাজধানীর মগবাজার বিশাল সেন্টারের সামনে তার ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ঘটনার সময় সেখানে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মী মো. নুরে আলম কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তিনি নিজের চোখে পুরো ঘটনা দেখেছেন।
নুরে আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাতের ডিউটিতে মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটি সিএনজিকে দ্রুতগতিতে আসতে দেখেন তিনি। ওই গাড়ি থেকে অস্ত্র হাতে এক যুবক নেমেই আসিফের প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আতঙ্কে তিনি দৌড়ে তিনতলায় উঠে যান। তিনি আরও জানিয়েছেন, ভোরের দিকে আজানের একটু আগে ঘটনাটি ঘটে, তখন সড়কে তেমন যানবাহন ও মানুষ ছিল না, আর গুলির বিকট শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় আসিফ আকবর বিশাল সেন্টার মার্কেটের তৃতীয় তলায় নিজের অফিসে, অর্থাৎ স্টুডিওতে ছিলেন। তার গাড়িতে গুলির পেছনে ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আসিফ নিজেও জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি কার্যালয়ে ছিলেন, সিসিটিভি ক্যামেরায় আশপাশের দৃশ্য দেখছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভোর ৪টা ৫২ থেকে ৫৪ মিনিটের মধ্যে গুলির ঘটনা ঘটে, তখন তার গাড়িতে কেউ ছিল না।
আসিফের ধারণা, যারা গুলি করেছে, তারা তার কার্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় সম্পর্কে জানত। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণত রাত ৮টা বা সাড়ে ৮টার দিকে তিনি কার্যালয়ে যান, আর ফজরের নামাজের আগে কিংবা পরে সেখান থেকে বাসায় ফিরেন। দুর্বৃত্তরা ওই সময়টাকেই বেছে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে তার, কারণ তিনি আর কিছুক্ষণ পরেই নিচে নামতেন। কারা ঘটনা ঘটিয়েছে, তা বুঝতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও নতুন তথ্য এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, কী কারণে আসিফের গাড়িতে গুলি করা হয়েছে, তা প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি, আর প্রাথমিকভাবে আসিফ নিজেও এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার সময় গাড়িতে কেউ ছিল না, আসিফ তখন বিশাল সেন্টারের তৃতীয় তলায় নিজের স্টুডিওতে ছিলেন, আর চালকের পেছনের আসন লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীর চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু পা দেখা যাচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. আবুল বাশার তালুকদার ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। ঘটনার পর আসিফের গাড়িটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি, এসআরবিসহ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
আলামত সংগ্রহের বিষয়েও জানা গেছে নতুন তথ্য। হাতিরঝিল থানার ওসি আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে আসিফ আকবর ও তার এক বন্ধুর উপস্থিতিতে গাড়ির পেছনের জানালা খুলে ভেতর থেকে একটি গুলির কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়েছে। গুলির ঘটনার পর গতকাল বিকেল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিশাল সেন্টারের সামনে অবস্থান করছিলেন।
যেভাবে হামলা হয়েছে, তার চিত্রও এখন স্পষ্ট। মগবাজার থেকে ওয়্যারলেসগামী সড়কের পাশে বিশাল সেন্টার মার্কেট। মার্কেটের সামনে ফুটপাত লাগোয়া পার্কিংয়ে আসিফের ব্যক্তিগত গাড়িটি রাখা ছিল। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা এক দুর্বৃত্ত গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, গুলিটি চালকের পেছনের আসন বরাবর করা হয়, এতে গ্লাস ভেঙে যায়। গতকাল বিকেলে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে আসিফ জানান, তিনি সুস্থ আছেন। সকালে পুলিশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, পরে বিকেলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার বাসায় এসে কথা বলেন।
এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, অনেকে নিন্দা জানিয়েছেন, আর প্রকাশ্যে এমন ঘটনায় আসিফের পরিবারের সদস্যরাও আতঙ্কে আছেন। এখন সবার নজর তদন্তের দিকে: সিসিটিভিতে শুধু পা দেখা গেলেও একাধিক সংস্থার তদন্তে হামলাকারীর পরিচয় বেরিয়ে আসে কি না, আর গুলির পেছনের কারণটা কী ছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
