পর্দায় মাত্র কয়েক মুহূর্তের একটা দৃশ্য। অথচ সেই দৃশ্যের শুটিংয়ে সময় লেগেছিল টানা তিন দিন। নব্বইয়ের দশকের ব্লকবাস্টার ছবি রাজা হিন্দুস্তানির সেই চুম্বন দৃশ্য নিয়ে আবার নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে, পরিচালক ধর্মেশ দর্শনের পুরোনো সাক্ষাৎকার ঘিরে। আমির খান আর কারিশমা কাপুরের ওই দৃশ্য আজও বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত দৃশ্য হিসেবে মনে রাখা হয়।
১৯৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছিল রাজা হিন্দুস্তানি। ধর্মেশ দর্শন পরিচালিত এই ছবিতে জুটি বেঁধেছিলেন আমির খান ও কারিশমা কাপুর। গল্পটা ছিল ট্যাক্সি ড্রাইভার রাজা আর ধনী পরিবারের মেয়ে আরতির প্রেমের। পরিবারের অমতে বিয়ে, তারপর সংসারের টানাপোড়েন, এই সরল গল্পেই মন জয় করেছিলেন দর্শক। বক্স অফিসে বড় সাফল্যের পাশাপাশি ছবির গানগুলোও আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু সব ছাপিয়ে যে দৃশ্যটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে, সেটা আমির আর কারিশমার দীর্ঘ চুম্বন দৃশ্য।
তখনকার বলিউডে পর্দায় এমন দৃশ্য ছিল বিরল। তাই দৃশ্যটা মুক্তির পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু দর্শক যা পর্দায় কয়েক মুহূর্তে দেখেছেন, তার পেছনে ছিল তিন দিনের কঠিন পরিশ্রম। পরিচালক ধর্মেশ দর্শন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল ভারতের উটিতে, ফেব্রুয়ারি মাসের কনকনে ঠান্ডায়। প্রবল হাওয়া, ঠান্ডা জল আর কুয়াশার মধ্যে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলত শুটিং। টেকের ফাঁকে ঠান্ডায় কাঁপতে হতো অভিনেতা অভিনেত্রীদের।
কারিশমা কাপুরের জন্য দৃশ্যটা ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জের। কারণ এর আগে কখনো কোনো সিনেমায় পর্দায় চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করেননি তিনি। বয়সেও তখন তিনি বেশ তরুণ। তাই অভিনেত্রীর স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টা মাথায় রেখে সেটে বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন পরিচালক। কারিশমার মা, প্রবীণ অভিনেত্রী ববিতা কাপুরকে সেটে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান ধর্মেশ দর্শন। এমনকি পুরো সিকোয়েন্সটা তিনি ববিতাকে বুঝিয়েও দিয়েছিলেন। শুটিংয়ের তিন দিনই মেয়ের পাশে ছিলেন ববিতা। কারিশমার অস্বস্তি বা বাড়তি চাপের বিষয়টা এড়াতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন পরিচালক।
পরে এক সাক্ষাৎকারে কারিশমা নিজেও মনে করিয়েছেন সেই কঠিন দিনগুলোর কথা। তিনি বলেছিলেন, লোকে বলে কী দারুণ চুমু, কিন্তু তিন দিন ধরে ওই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁদের। ফেব্রুয়ারিতে উটির শুটিং, প্রচণ্ড ঠান্ডা, ঝড়ো হাওয়া আর ঠান্ডা জলে অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছিল। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়েছে। টেকের মাঝে কাঁপছিলেন তাঁরা। বিরক্ত হয়ে একসময় তাঁরা নাকি বলেই ফেলেছিলেন, এই চুম্বন দৃশ্যের শুটিং কবে শেষ হবে।
ছবিটা নিয়ে পরিচালকের আরেকটা মজার স্মৃতিও আছে। ধর্মেশ দর্শন জানিয়েছেন, রাজা হিন্দুস্তানির কাজ শুরু হওয়ার আগে আমির খান সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চেয়েছিলেন। পরিচালক তখন একটা শর্ত দিয়েছিলেন, হস্তক্ষেপ করা যাবে না। নিজের পছন্দের নায়িকা, নিজের পছন্দের গান, অর্চনা পূরণ সিংকে নেওয়া আর চুম্বন দৃশ্যটা নিজের মতো করে তোলা, এই সিদ্ধান্তগুলো পরিচালকেরই থাকবে। আমির সেই শর্ত মেনেই কাজ করেছিলেন।
দৃশ্যটা ঘিরে প্রযোজকদের সঙ্গে পরিচালকের মতের অমিলও হয়েছিল। ছবির প্রযোজকেরা আমির ও কারিশমার চুম্বন দৃশ্যটি প্রচারের জন্য পোস্টারে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, যাতে ছবি নিয়ে আরও আলোচনা তৈরি হয়। কিন্তু পরিচালক ধর্মেশ দর্শন তাতে রাজি হননি। তাঁর আপত্তিতেই পোস্টারে জায়গা পায়নি ওই দৃশ্য।
আজ, প্রায় তিন দশক পরেও এই গল্পটা কেন ফিরে আসে? একটা কারণ নস্টালজিয়া, নব্বইয়ের দশকের বলিউডের সোনালি সময়ের প্রতি দর্শকের টান। আরেকটা কারণ, সেটে অভিনেত্রীর স্বাচ্ছন্দ্য আর সম্মতির প্রশ্ন, যা আজকের দিনের আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্ব পায়। মায়ের উপস্থিতিতে, পুরো সিকোয়েন্স বুঝিয়ে দিয়ে, চাপমুক্ত পরিবেশে দৃশ্যটা তোলার ওই সিদ্ধান্ত আজকের দৃষ্টিকোণ থেকেও আলোচনার যোগ্য।
রাজা হিন্দুস্তানি তাই শুধু একটা হিট ছবি নয়, বলিউডের বদলে যাওয়া সময়েরও একটা দলিল। আমির খান আর কারিশমা কাপুরের রসায়ন, ধর্মেশ দর্শনের জেদ আর উটির ঠান্ডায় তিন দিনের শুটিং, সব মিলিয়ে এই দৃশ্য আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। পুরোনো সাক্ষাৎকারগুলো নতুন করে সামনে আসতেই আবার সেই স্মৃতি ফিরেছে ভক্তদের মধ্যে।
